ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে আর কদিন পরই বিদায় নেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জনপ্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে কাটে এই সরকারের দেড় বছর।
আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতা, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক বিরোধ, পদোন্নতি-পদায়নসহ স্বার্থ আদায়ে সরকারকে চেপে ধরা এবং উপদেষ্টা পরিষদের মতভেদের কারণে জনগণকে বহুল কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয় এই সরকার। এ সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা উপদেষ্টাদের ঘেরাও এবং সচিবালয় অচল করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে একাধিকবার। জনপ্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে নিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার বিষয়ে সরকারের পাঁচ উপদেষ্টা, বর্তমান ও সাবেক আট সচিব এবং জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ। আমলা ও উপদেষ্টাদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। বিশেষজ্ঞরা দায়ী করেছেন আমলাতন্ত্রের উচ্চাভিলাষী মনোভাব এবং সরকারের নতজানু অবস্থানকে।
গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা–র শাসনামলে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামো বহাল রেখে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসন সাজাতে গিয়ে লেজে-গোবরে অবস্থায় পড়ে—এমন অভিযোগ এসেছে একাধিক সূত্র থেকে। উপদেষ্টাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও ব্যর্থতার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও প্রশাসনের বড় অংশ অপরিবর্তিত থাকায় সেটিই পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় বলে মত দিয়েছেন সাবেক কয়েকজন শীর্ষ আমলা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ইমেজ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কাঠামো বদলাতে দৃঢ় পদক্ষেপ না নেওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিনির্ধারণে উপদেষ্টা পরিষদের তুলনায় আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশ বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। ফলে সংস্কার উদ্যোগ বারবার বাধার মুখে পড়ে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচ টি ইমাম এবং বর্তমান উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার–এর প্রভাব নিয়ে প্রশাসনে নানা আলোচনা রয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দলীয় কাঠামোর ভেতরে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক ধারা পুরোপুরি বদলানো হয়নি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রশাসন ঠিকমতো কাজ করছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ঘিরে সচিবালয়ে অচলাবস্থা, ঘেরাও ও হট্টগোলের ঘটনাও ঘটে। পদোন্নতি কাঠামো, ক্যাডার বণ্টন এবং স্বাস্থ্য–শিক্ষাকে আলাদা কাঠামোয় নেওয়ার প্রস্তাব প্রশাসন ক্যাডারের বড় অংশের বিরোধিতার মুখে পড়ে।
সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব চাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনে অস্বস্তি তৈরি করে বলে জানা গেছে। একইভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশে পরিবারের স্থায়ী বসবাস সংক্রান্ত তথ্য চাওয়াও আমলাতন্ত্রের একটি অংশ ভালোভাবে নেয়নি।
কিছু উপদেষ্টা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে প্রশাসন সরকারের নীতি বাস্তবায়নে আন্তরিক সহযোগিতা করেনি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাইল ঘোরানো ও আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত হয়নি অনেক ক্ষেত্রে।