বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঐক্য, ধৈর্য ও আপসহীনতার প্রতীক হিসেবে যাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এক গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বে তাঁর উত্থান ছিল সময়ের এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি নেতৃত্বে তৈরি হয় শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা। তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেও রাজনৈতিক দুর্বলতা ও বয়সজনিত কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। সেই প্রেক্ষাপটে দলের ভেতর থেকেই খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার দাবি ওঠে। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং একই বছরের ১ মে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দলের নেতৃত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই তাঁকে প্রতিকূল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন খালেদা জিয়া। বারবার কারাবরণ, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক চাপে পড়েও তিনি অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের অধীনে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তে তিনি অনড় থাকেন। অন্য দলগুলো সিদ্ধান্ত বদল করলেও খালেদা জিয়া অবস্থানে অটল থাকায় দেশের মানুষের কাছে তিনি দৃঢ় ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদের পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে প্রতিবারই বিজয়ী হন। কোনো কোনো নির্বাচনে একাধিক আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই জয় পান।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় বিদেশে পাঠানোর চাপ থাকলেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে চরম চাপে পড়ে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয় এবং দলীয় নেতাকর্মীরা নানামুখী নিপীড়নের শিকার হন। তবুও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং নেতৃত্বে অটল থাকেন।
২০১৫ সালে তাঁর জীবনে নেমে আসে ব্যক্তিগত এক গভীর বেদনা—ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও তিনি দলের নেতৃত্ব ও দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসেননি।
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকাকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাননি। এই সময় থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব লন্ডন থেকে পরিচালনা করতে থাকেন তারেক রহমান।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে সব দণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে, ৫ আগস্ট হাসপাতালে থাকা অবস্থায় দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া তাঁর ভিডিও বার্তায় শান্তি ও ঐক্যের আহবান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া প্রতিহিংসা নয়, বরং ঐক্য ও শান্তির রাজনীতির কথা বলে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ছিল—ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসা, সহিংসতার বিপরীতে শান্তি এবং বিভেদের বিপরীতে জাতীয় ঐক্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে ব্যক্তিগত ত্যাগ, ধৈর্য ও আপসহীন নেতৃত্বের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।