কোচিং–প্রাইভেট বাণিজ্যে লাগাম টানতে নতুন উদ্যোগ সরকারের

দেশ এডিশন | শিক্ষা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ মাস আগে

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলতি বছরের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে শীতকালীন ছুটি। নিয়ম অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, তার আগেই কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট ব্যাচগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষার সময় থেকেই কোচিং ও প্রাইভেটে ভর্তির তোড়জোড় শুরু হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়েও কোচিং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর ফলে একদিকে অভিভাবকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

নীতিমালা থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ নেই

কোচিং বাণিজ্য বন্ধে সরকারের নীতিমালা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এর কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। রাজধানীসহ দেশের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘিরেই কোচিং–প্রাইভেট বাণিজ্যের বিস্তার সবচেয়ে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যে লাগাম টানতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি প্রকাশিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২৫-এ কোচিং বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। নীতিমালার ২৪ নম্বর ধারার ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে—শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্য থেকে বিরত থাকবেন।

এ ছাড়া কোচিং বাণিজ্য বন্ধে বিদ্যমান নীতিমালা বাস্তবায়নের পথে যেসব সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে নীতিমালাটি যুগোপযোগী করার প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা না মানলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বিবেচনায় না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

২০১২ সালের নীতিমালার কথা

হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ প্রণয়ন করে, যা ২০১৯ সালে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। তবে বাস্তবে এই নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ আজও দেখা যায়নি।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট অনুমতি নিয়ে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। কোনো শিক্ষক বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হতে বা এর মালিক হতে পারবেন না।

নীতিমালা লঙ্ঘন করলে এমপিও স্থগিত বা বাতিল, বেতন-ভাতা বন্ধ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এসবের প্রয়োগ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার অভিভাবকরা জানান, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালেই কোচিং সেন্টারগুলো ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিজস্ব প্রাইভেট ব্যাচে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। ক্লাস শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ দেওয়া হয় এবং প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়—এমন অভিযোগও করেছেন অভিভাবকরা।

অভিভাবকদের মতে, অতিরিক্ত কোচিং ও প্রাইভেটের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পড়ালেখার চাপে অনেক শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় শিক্ষার মানও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

সরকারের অবস্থান

কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য পাঠাতে সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও পর্যালোচনা চলছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার একান্ত সচিব এ কে এম তাজকির-উজ-জামান বলেন, “শুধু নীতিমালা করলেই হবে না। কেন এতদিন বাস্তবায়ন হয়নি, তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। নীতিমালাকে যুগোপযোগী করেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

আইনের দাবি

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এখন আইন করে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। তবেই শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

error: Content is protected !!