জন্মনিবন্ধন ঘিরে বছরের পর বছর ভোগান্তিতে আছেন দক্ষিণ সিটির হাজারো নাগরিক। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের দায়িত্ব রেজিস্ট্রার জেনারেলের হলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস সংস্থার আয় বাড়ানোর নামে আইন অমান্য করে নিজস্ব সার্ভার চালু করেন। এই বিতর্কিত উদ্যোগে ৭৯ হাজারের বেশি নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যুসনদ অকার্যকর হয়ে পড়ে—তাদের আবার নতুন করে ফি দিয়ে আবেদন করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে একজন নগরপিতার ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ ও ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ হিসেবে দেখছেন।
এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আজ জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস পালন করছে; তবে নাগরিকদের মুখে এখনো তাপস আমলের সেই হয়রানির গল্প।
খিলগাঁও আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ছেলে রাসেল রানার জন্মসনদ ফের তুলেছেন নাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সাবেক মেয়র তাপসের আমলে দেওয়া জন্মসনদ ভুয়া বলে জানানো হয়। আগে ৫০ টাকা দিয়েছিলাম, এখন আবার দিতে হচ্ছে। আগের টাকার কী হলো জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর নেই। দ্রুত সনদ চাইলে বলে—জাতীয় সার্ভার কাজ করে না।’
ধানমন্ডির ইমরান কবির জানান, তার চার বছরের ছেলে মাসুদ কবিরের জন্মসনদ পাসপোর্ট অফিস থেকে ‘ভুয়া’ হিসেবে ফেরত এসেছে। ‘সেবা দেওয়ার কথা সিটি করপোরেশনের; উল্টো হয়রানি করছে তারা,’ অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নতুন আবেদনে সরকার নির্ধারিত ফি দিতে হচ্ছে, কিন্তু আগের টাকার কোনো ফেরত বা সমন্বয় নেই। শুধু জন্ম নয়—মৃত্যুনিবন্ধনের সনদও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে তাপস নিজস্ব সার্ভার চালুর সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার চেষ্টা করলেও জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কায় কেউ সাড়া দেয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালে তাপস মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর। ২০২৩ সালের জুনে রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে বিরোধে দক্ষিণ সিটির নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় তিন মাসের জন্য। নাগরিক ভোগান্তি বাড়তে থাকায় ৪ অক্টোবর থেকে ডিএসসিসি নিজস্ব সার্ভারে সনদ দেওয়া শুরু করে। কিন্তু জাতীয় সার্ভারের সঙ্গে কোনো সংযোগ না থাকায় সেসব সনদ কোথাও কার্যকর হয়নি।
রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় বিষয়টি স্থানীয় সরকার সচিবকে লিখিতভাবে জানায়, এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নিয়মিতভাবে ‘নিজস্ব সার্ভার’ ব্যবহারের বিরোধিতা করে চিঠি পাঠানো হয়।
তাপসের নির্দেশে প্রায় সাড়ে ১০ মাসে ৭৮,৯৫৬টি জন্মনিবন্ধন ও ১,৪৭১টি মৃত্যুনিবন্ধন সম্পন্ন হয়—যেখানে প্রায় ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব ওঠে। বর্তমানে ডিএসসিসির ৭৫ ওয়ার্ডে ১০ আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হলেও তা এখন জাতীয় সার্ভারে একীভূত।
তবে তাপসের আমলের সনদে স্কুল-কলেজে ভর্তি, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স করা সম্ভব হয়নি—জাতীয় সার্ভারের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগ না থাকায় তথ্য যাচাই অসম্ভব ছিল। ফলে হাজারো পরিবার প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।
রেজিস্ট্রেশন সহকারী মো. সাজহার উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় সার্ভারে দিনে চাপ বেশি থাকে, তাই রাতে কাজ করতে হয়।’
অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু আসলাম বলেন, ‘করপোরেশনের সার্ভার থেকে যারা সনদ নিয়েছেন, সবাই বিপাকে। এখন নতুন আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
আইন অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যতীত কোনো নাগরিক সরকারি সেবা, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারেন না। রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে এমন ২২টি সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা চুক্তি রয়েছে—যা ২০০৪ সালের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন এবং ২০১৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী। এসব আইনেই স্পষ্টভাবে বলা আছে—সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা ও নিবন্ধন তথ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব একমাত্র রেজিস্ট্রার জেনারেলের, ডিএসসিসির নয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় সার্ভার থাকলে আলাদা সার্ভার চালানো ঠিক হয়নি। এখন যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের আবেদনে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
আগের ফি ফেরত না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফেরত বা সমন্বয় করা গেলে ভালো হতো। টাকা কোন খাতে গেছে, সেটি জানি না—খোঁজ নিচ্ছি।’
সূত্র: দেশ এডিশন ✅