শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় বন্যহাতির আক্রমণ থেকে মানুষ ও ফসল রক্ষার লক্ষ্যে নেওয়া সোয়া দুই কোটি টাকার সোলার ফেন্সিং প্রকল্প কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এসব প্রকল্প হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব কমাতে কোনো ভূমিকা রাখেনি; বরং প্রকল্পের আড়ালে হয়েছে ব্যাপক লুটপাট ও সরকারি অর্থের অপচয়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শেরপুর জেলায় হাতি-মানুষ সংঘাতে অন্তত ৩৬ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং মারা গেছে ৩৫টি বন্যহাতি। এ ছাড়া শত শত পরিবার বসতঘর ও ফসল হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ সংঘাত নিরসনে নেওয়া সরকারি উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা।
শেরপুরের ভারত সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বন্যহাতির চলাচল রয়েছে। খাদ্যের সন্ধানে হাতির দল প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসে। এতে মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি হাতিও প্রাণ হারাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১৭ সালে হাতি ঠেকাতে সোলার ফেন্সিং প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। প্রথম ধাপে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণ করা হয়। তবে নিম্নমানের সরঞ্জাম ও ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে শুরুতেই তা অকার্যকর হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে আবারও প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ কিলোমিটার সোলার ফেন্সিং নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ প্রকল্পও কার্যত কোনো কাজে আসেনি। অনেক স্থানে বেড়া ভেঙে পড়েছে, কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আবার কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও পাতলা তার, কোথাও দুর্বল খুঁটি বসানো হয়েছে, যা সহজেই নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের মতে, প্রকল্পগুলো ছিল মূলত লোক দেখানো এবং এর আড়ালে সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সাঈন’ শেরপুর-এর নির্বাহী পরিচালক মুগনিউর রহমান মনি বলেন,
“রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে সোলার ফেন্সিং প্রকল্প সফল হয়নি। পুরো প্রকল্পের অর্থ কার্যত গচ্চা গেছে।”
স্থানীয় বিশিষ্টজনরাও একই অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া এমন প্রকল্প কখনোই টেকসই হতে পারে না।
অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন,
“বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। ভবিষ্যতে সামাজিকভাবে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি কার্যকর ও টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও জানান, শুধু বেড়া নির্মাণ নয়, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ (এলিফ্যান্ট করিডর) সংরক্ষণ, দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্বে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন মানুষ এবং মারা গেছে ৩৫টি বন্যহাতি। এর বাইরে বহু পরিবার ফসল ও বসতঘর হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হয়, তবে দায় কার? তারা অবিলম্বে প্রকল্পের অর্থব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং কার্যকর, টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা।