আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক দানা বাঁধছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দাবি করা হচ্ছে—নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি স্বতন্ত্র, ভিন্ন দল কিংবা কৌশলগত ব্যানারে নির্বাচনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।
নির্বাচনি আইন ও আচরণবিধি অনুযায়ী কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নামে বা প্রতীকে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবে অভিযোগ উঠেছে—ব্যক্তিগত পরিচয়, পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, পারিবারিক প্রভাব কিংবা অন্য দলের মনোনয়ন ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞার ফাঁকফোকর কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। এতে নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকাশ্য দলীয় ব্যানার না থাকলেও বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অথবা ছোট রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের ঘনিষ্ঠজন, উপদেষ্টা এবং মাঠপর্যায়ের পদধারী নেতারা।
এদের একটি অংশ গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় পার্টি (এরশাদ), জাতীয় পার্টি (জেপি) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেস–এর মতো দলের আবরণে প্রার্থী হয়েছেন বলে দাবি উঠেছে।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জে ছদ্মবেশী প্রার্থীদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি বলেই মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গোপালগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এম আনিসুল ইসলাম (ভুলু মিয়া)। তিনি নিজেকে সাধারণ আওয়ামী কর্মী বলে পরিচয় দিলেও শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তার কর্মী-সমর্থকদের ভূমিকা ঘিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।
এ আসনে আলোচিত আরেক নাম কাবির মিয়া। তিনি মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য এবং এবার গণঅধিকার পরিষদ–এর মনোনয়ন নিয়ে মাঠে নেমেছেন। স্থানীয় গুঞ্জন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর এক সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশের মতে, তিনি জনপ্রিয় হলেও নির্বাচনে তার অনুসারীদের আচরণ নিয়ে শঙ্কা আছে।
গোপালগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপদেষ্টা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান ভূঁইয়া লুটুল। তার সঙ্গে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএইচ খান মঞ্জুর–এর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা থাকায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে—জয়ের পাল্লা ভারী না দেখলে শেষ মুহূর্তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
টাঙ্গাইলের রাজনীতিতে দল বদল ও পরিচয় আড়ালের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
টাঙ্গাইল-১ আসনে আইনজীবী মুহম্মদ ইলিয়াস হোসেন জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
টাঙ্গাইল-৬ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটির সহসভাপতি তারেক শামস খান হিমু এবার জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তিনি জুলাই বিপ্লবের পর আত্মগোপনে ছিলেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। একই আসনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এক সদস্য ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে গণফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মফিজুল ইসলাম খান কামাল প্রার্থী হলেও তার রাজনৈতিক শিকড় আওয়ামী লীগে প্রোথিত বলে দাবি উঠেছে।
ফরিদপুর-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন মধুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবুল বাশার। পাশাপাশি শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন আওয়ামী কৃষক লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আরিফুর রহমান দোলন। রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রথমে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করলেও আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান বলেও জানা গেছে।
বগুড়া-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সারিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শাহজাদি আলম লিপি। তিনি বিতর্কিত সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি হামিদুল আলম মিলনের স্ত্রী—এ পরিচয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
খুলনা-৩ আসনে প্রার্থী মুরাদ খান লিটন–এর পারিবারিক পরিচয়ও আলোচনায়; তার বাবা খান ফজলার রহমান খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে নূর হাকিম ‘বাংলাদেশ কংগ্রেস’–এর হয়ে প্রার্থী হয়েছেন। অতীতেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন এবং ডামি নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েছিলেন—এমন কথাও এসেছে প্রতিবেদনে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল—নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা কিংবা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে—সর্বশেষ এ ঘোষণা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন,
“নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশ একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের সচেতন হতে হবে—কোন প্রার্থী কোন আদর্শের প্রতিনিধি এবং কাদের হয়ে তিনি নেপথ্যে কাজ করছেন। নাম পাল্টে বা দলের লেবাস বদল করে বিপ্লবের চেতনাকে নস্যাৎ করার অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত পরিচয়ে প্রার্থী হওয়া আইনত নিষিদ্ধ না হলেও নিষিদ্ধ সংগঠনের হয়ে কার্যক্রম, অর্থায়ন বা সমন্বয় প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ আসনে পেশিশক্তির ব্যবহার ও ভোটকেন্দ্র দখলের আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির বিশেষ টহল এবং আগের রাত থেকেই নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—এ নির্বাচন শুধু জয়-পরাজয়ের প্রতিযোগিতা নয়; বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংস রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর পরীক্ষাও বটে।