প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কে এক নতুন ভিত্তি তৈরি হতে যাচ্ছে। আগামী ২২ থেকে ২৬ জুন সস্ত্রীক এই দ্বিপাক্ষিক সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশে এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক সফর শেষে ২২ জুন বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবায়দা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন। ২৩ জুন দালিয়ানে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে ২৪ জুন বুলেট ট্রেনে বেইজিং পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী।
আসন্ন সফরে চীনের দুই শীর্ষ নীতিনির্ধারক—প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আলাদা আলাদা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বিগত দুই দশকের বেশি সময় পর শীর্ষ বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ‘যৌথ বিবৃতির’ পরিবর্তে একটি ‘যৌথ ইশতেহার’ ঘোষণা করা হবে। এর আগে ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বেইজিং সফরের সময় এমন যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছিল। এছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথাও রয়েছে।
এই সফরে শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), যোগাযোগ ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক অংশীদারত্ব বাড়াতে ৩টি মূল চুক্তিসহ ১০টিরও বেশি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা, রেল যোগাযোগ, গ্রিন এনার্জি ও স্বাস্থ্যসহ ১২-১৩টি খাতে বিশেষ প্রকল্প সহযোগিতা চাওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের আশা, বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্পে চীনের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে এই সফর থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্তবাণিজ্য জোট আরসিইপি (RCEP), ব্রিকস (BRICS) ও সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনে (SCO) যুক্ত হতে চীনের সমর্থন চাইবে বাংলাদেশ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য প্রকল্প সহায়তার পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্যাশ সাপোর্ট বা আর্থিক তারল্য নিশ্চিত করা জরুরি, যা এই সফরের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, প্রথম বিদেশ সফরে প্রথাগত বলয়ের বাইরে গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। এই জোড়া সফর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি এশীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।