দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সামরিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক সমঝোতা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। উভয় পক্ষই এই চুক্তিকে নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে বড় এক প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা হিসেবে তুলে ধরছে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আলাদাভাবে এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা লাভ করতে যাচ্ছে। তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা এবং দেশের নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে সক্ষম হয়েছে।
এই চুক্তিটি মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশদ আলোচনার জন্য আগামী ৬০ দিনের একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। একই সাথে এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানি জাহাজের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং আটকে থাকা ইরানি অর্থ ও সম্পদ পর্যায়ক্রমে ছেড়ে দেবে। এছাড়াও ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি বিশাল তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও আলোচনাধীন রয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘বড় জয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর দাবি, এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখার যে বৈশ্বিক লক্ষ্য ছিল, তা পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় খুলে যাওয়া। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়া বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার আবার সচল হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে আমেরিকার সাধারণ মানুষ গ্যাসের আকাশচুম্বী দাম এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছিলেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই চুক্তিটি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় স্বস্তি দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অবশ্য এই চুক্তি নিয়ে মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরে, বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের কয়েকজন নেতা ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। সমালোচনার জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও তেলের বাজারের জন্য কেবলই বড় এক সাফল্য নিয়ে আসবে। হোয়াইট হাউজও স্বীকার করেছে যে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব বাণিজ্যের সুরক্ষার স্বার্থেই এই সমঝোতা স্মারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রশাসন এখন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।