Π আতাউর রহমান :
বাংলাদেশ একটি বহুজাতি ও বহুধর্মের দেশ। এখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ শত শত বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। এদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি—যা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। দুর্গাপূজা সেই সম্প্রীতির বড় একটি আয়না, যেখানে মুসলিম-অমুসলিম প্রতিবেশীরা মিলেমিশে আনন্দ ভাগাভাগি করে।
ইসলামের শিক্ষা হলো মানবিক মর্যাদা, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। আল-কুরআনে বলা হয়েছে— “ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৬)। অর্থাৎ, মানুষ তার বিশ্বাসে স্বাধীন এবং মুসলমানের দায়িত্ব হলো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি ন্যায়, সদাচরণ ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে “মদিনার সনদ” প্রণয়ন করেছিলেন, যা ছিল ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও নাগরিক সহাবস্থানের চমৎকার এক উদাহরণ। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, ইসলামের মূল চেতনা হলো সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচার।
এই সম্প্রীতির জীবন্ত নিদর্শন দেখা যায় সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণাবর্তে নদী তীরবর্তী তিলপাড়া ইউনিয়নের শানেস্বর বাজারে। সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ ও একটি মন্দির। ৭২ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে পাশাপাশি চলছে নামাজ ও পূজা, অথচ কোনো দ্বন্দ্ব বা সংঘাত ঘটেনি। বরং একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে গড়ে উঠেছে অপূর্ব সহাবস্থান। আজান হলে মন্দিরে ঢাক-ঢোল বন্ধ থাকে, আবার নামাজ শেষে শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয় পরিবেশ। স্থানীয়দের ভাষায়, “আমরা সবাই মানুষ, ধর্ম আলাদা হলেও সম্প্রীতি এক।” এ যেন বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সৌন্দর্যের প্রতীকচিহ্ন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্গাপূজার মতো উৎসব মুসলিম-অমুসলিম ভ্রাতৃত্বের পরীক্ষাক্ষেত্র। মুসলমানরা যদি প্রতিবেশীর আনন্দে সহযোগিতা করে, নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করে, তবে সেটিই হবে ইসলামের প্রকৃত অনুসরণ। ধর্মীয় উগ্রতা বা বিদ্বেষমূলক আচরণ কখনোই ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং রাসূল (সা.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট দেয়, আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব।” (আবু দাউদ)।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে ধর্মের নামে সংঘাত ও বিভাজন বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো সমাজে দুর্গাপূজা আমাদের জন্য সম্প্রীতি জাগ্রত করার সুযোগ হয়ে আসতে পারে। পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা দেওয়া যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়েরও কর্তব্য হলো সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। বর্তমান সময়ে যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ধর্মের নামে হিংসা, বিভাজন ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন শানেস্বর বাজারের এই উদাহরণ আমাদের জন্য অনন্য শিক্ষণীয়। এটি প্রমাণ করে, সম্প্রীতি যদি স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠে, তবে তা জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই তৈরি হবে সত্যিকারের “বাঙালি সংস্কৃতির মানবিক ঐক্য”—যেখানে ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত, কিন্তু সম্প্রীতি হবে সামষ্টিক।
দুর্গাপূজা শুধু সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক সংস্কৃতির অংশ। ইসলামের শিক্ষা যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করি, তবে বুঝতে পারব—অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান জানানোই প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ। শানেস্বর বাজারের মসজিদ-মন্দির একসাথে দাঁড়িয়ে আছে সেই বার্তার প্রতীক হয়ে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে এই সম্প্রীতির চর্চা যত বিস্তৃত হবে, বাংলাদেশ ততই হবে শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিকতার আলোকিত ভূমি।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল রনি, সহ-সম্পাদক: আতাউর রহমান
যোগাযোগ: +𝟖𝟖 𝟎𝟗𝟔𝟗𝟕𝟓𝟎𝟏𝟎𝟏𝟎, বিজ্ঞাপন: +𝟖𝟖 𝟎𝟏𝟔𝟑𝟗 𝟑𝟏𝟑𝟏𝟑𝟏
১২২/৭, ব্লক–ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ।
স্বত্ব © ২০২৬ | দেশ এডিশন