দেশের পোলট্রিশিল্পের দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকার অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’। নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বাংলাদেশি পোলট্রি পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা হিসেবে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি এই নীতিমালার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে খাতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে ইতিমধ্যেই তীব্র আইনি ও অর্থনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে, এক দিন বয়সী বাচ্চা (ডে-ওল্ড চিক) আমদানি সীমিত বা সম্পূর্ণ বন্ধের উদ্যোগ, প্রচলিত জীবন্ত মুরগির বাজার পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং করপোরেটদের চুক্তিভিত্তিক খামারব্যবস্থার প্রসার নিয়ে খামারিদের মাঝে স্পষ্ট মতভেদ দেখা দিয়েছে। একদিকে বড় শিল্পোদ্যোক্তারা বৈশ্বিক মানদণ্ডের শিল্প গড়তে এই পরিবর্তনকে সময়ের দাবি বললেও, প্রান্তিক খামারিদের অভিযোগ— নীতিমালার বিভিন্ন ধারা শেষ পর্যন্ত গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণকেই আরও শক্তিশালী করবে।
দেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জীবিকা নির্ভরশীল এ খাতটি গত এক দশকে বাচ্চার দামের ওঠানামা, খাদ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সিন্ডিকেটের কারণে বারবার চরম অস্থিরতার মুখে পড়েছে। নতুন নীতিমালায় এসব সমস্যা ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় জাতীয়, কারিগরি, আমদানি তদারকি এবং মান নিয়ন্ত্রণসহ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদারকি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।
নীতিমালার সবচেয়ে কঠোর অংশটি সাজানো হয়েছে মূলত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে। ক্ষতিকর অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) মোকাবিলায় পোলট্রি খাদ্যে যেকোনো ধরনের অনিবন্ধিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পোলট্রি ফিডে ‘মিট অ্যান্ড বোন মিল’ ব্যবহারের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে খামারিদের মুরগিতে কোনো ওষুধ প্রয়োগের পর সুনির্দিষ্ট ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ বা ওষুধের কার্যকারিতার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মুরগি ও ডিম বাজারে বিক্রি করা যাবে না। বিশেষজ্ঞরা এএমআর প্রতিরোধে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।
তবে এই নীতিমালার মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে বড় ও যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছেন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, এই নীতিমালার বাস্তবায়ন বা তদারকি কাঠামোয় প্রান্তিক খামারিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব বা কণ্ঠস্বর রাখা হয়নি। তাঁর মতে, কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাহিদা ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই নীতিমালার অনেকগুলো ধারা গোপনে তৈরি করা হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত হিমাগার, সংগ্রহ কেন্দ্র ও ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রীয় বিপণনব্যবস্থা গড়ে না তুলে যদি হুট করে জীবন্ত মুরগির বাজার বন্ধ করা হয়, তবে সাধারণ খামারিরা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবেন এবং বাজার সম্পূর্ণ করপোরেটদের কবজায় চলে যাবে।
অন্যদিকে সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী। তিনি মনে করেন, ডে-ওল্ড চিক বা বাচ্চার আমদানিতে আকস্মিক ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিলে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো মহামারি বা বার্ড ফ্লুর মতো পরিস্থিতিতে স্থানীয় হ্যাকারির উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের খামারিরা গভীর সংকটে পড়বেন। তাই জরুরি অবস্থায় আমদানির একটি স্পষ্ট আইনি বিধান নীতিমালায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফআইএবি) সভাপতি মসিউর রহমানের মতে, জীবন্ত মুরগির বাজার বন্ধের এই সাহসী উদ্যোগ পুরো পোলট্রিশিল্পের জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ বা ইতিবাচক রূপান্তর হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশে আধুনিক প্রসেসিং শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজনীয় প্রসেসিং যন্ত্রপাতি আমদানিতে সরকারকে অবশ্যই শুল্ক ও কর-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।