দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে গতিশীল করতে এবং প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বেসরকারি খাতকে প্রতিষ্ঠা করতে আমূল পরিবর্তন এনে পাস হয়েছে ২০ blankets ২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। গতকাল বুধবার (১ জুলাই) থেকে দেশজুড়ে কার্যকর হওয়া এই নতুন বাজেটটি গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পাস হয়। এর আগে গত ১১ জুন মহান সংসদে এ বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছিলেন মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংসদীয় আলোচনা ও জনমতের ভিত্তিতে শুরুতে ঘোষিত বাজেটের বিভিন্ন খাতে ছাড় ও সুবিধার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে শেষ সময়ে অর্থবিলে রেকর্ড ৬৪টি সংশোধন আনা হয়েছে। বিগত এক দশকের বাজেটগুলোর লক্ষ্য যেখানে ছিল ভ্যাট ও করের বিস্তার এবং কঠোর রাজস্ব আহরণ, সেখানে এই বাজেটে সরকার সম্পূর্ণ উল্টো ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি অবলম্বন করেছে।
নতুন বাজেটে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা প্রথমে অপরিবর্তিত রাখা হলেও, অর্থবিল পাসের দিন তা একলাফে ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত ‘নবম বেতন কাঠামো’র অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি মাথায় রেখে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ভারসাম্য রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, জনমনে বিভ্রান্তি ও তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা কালো টাকা সাদা করার বহুল বিতর্কিত বিশেষ বিধানটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। এছাড়া জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং বণ্টন দলিল বা নামজারি নিবন্ধনের জন্য টিআইএন (TIN) সনদ জমা দেওয়ার জটিল বাধ্যবাধকতাও জনস্বার্থে তুলে নেওয়া হয়েছে। খুচরা দোকানদারদের ওপর চাপানো অতিরিক্ত ভ্যাটও শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে।
উৎপাদনমুখী দেশীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং রপ্তানিমুখী খাতকে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও করনীতির রূপরেখা দিয়ে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের করপোরেট কর হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়েছে। আইটি, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রিক যানবাহন (EV) ও পুঁজিবাজারে একগুচ্ছ কর-ছাড় ও শুল্ক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম কে মুজেরী এই বাজেট প্রসঙ্গে বলেন, “নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এতে একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই ব্যাপক ছাড় ও কর-সুবিধার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর শতভাগ বাস্তবায়নের ওপর। রাজস্ব প্রশাসনের আমূল সংস্কার, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং উন্নয়ন ব্যয়ের অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করাই হবে প্রধান পরীক্ষা।”
অর্থনীতির চিরাচরিত দর্শন অনুযায়ী, করের হার কমিয়ে অর্থনীতির আকার বড় করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হলেও সাময়িক মেয়াদে রাজস্ব ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, “রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের কারণে বাজেটে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো বাস্তবে কার্যকর করতে না পারলে জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।”
এছাড়া বাজেটের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো জানিয়েছে, কর-ছাড়ের ছড়াছড়ি থাকলেও দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরাসরি কোনো মহাপরিকল্পনা এই বাজেটে স্পষ্ট নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME) খাতের জন্য আলাদা কোনো বড় কর-প্রণোদনা রাখা হয়নি। পাশাপাশি কৃষি খাতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এবং সরাসরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুল্কনীতির কার্যকর ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।