রাজশাহী অঞ্চলের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক নীরব সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। চিকিৎসকের চেম্বার হয়ে প্যাথলজির দীর্ঘ বারান্দা পেরিয়ে ফার্মেসিতে গিয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অসহায় রোগীরা। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র তথা প্রেসক্রিপশনের দীর্ঘ ফর্দ আর জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্রমাগত বাড়তে থাকা দামের সাথে যেন কোনোভাবেই পেরে উঠছেন না সাধারণ মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে ওষুধের দাম বেড়ে চলায় নি¤œ ও মধ্যবিত্ত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এখন এক দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওর্য়াডে ভর্তি হওয়া রোগীর জন্য নগরীর লক্ষ্মীপুর বাজারে ওষুধ কিনতে আসা এক ভুক্তভোগী স্বজন আক্ষেপের সুরে বলেন, “আগে যে ওষুধ ৪৫ টাকায় কিনতাম, এখন তার জন্য ৬০ টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে যদি দাম বাড়তেই থাকে, তাহলে আমাদের মতো গরিব মানুষদের চিকিৎসা না পেয়ে মরে যেতে হবে। ডাক্তারের ফি আর পরীক্ষার খরচের পর বাড়তি দামে ওষুধ কেনা আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।”
রাজশাহী নগরীর চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ও ফার্মেসি মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য ও বাজারের প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডেঙ্গু, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও গ্যাস্ট্রিকজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
ক্লিনিক পাড়া হিসেবে পরিচিত নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়ের ওষুধের বাজার ঘুরে দাম বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কিছু চিত্র পাওয়া গেছে:
নাপা ও প্যারাসিটামল: ২০ টাকার নাপা সিরাপ এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। ৮ থেকে ১০ টাকার প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের পাতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়। প্যারাসিটামল ৬৬৫ মিলিগ্রামের পাতা ১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ টাকা।
গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ: ৪৫ টাকার সেকলো ট্যাবলেটের পাতা কিনতে রোগীদের গুনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ইসমিপ্রাজল ৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭ টাকা হয়েছে।
হৃদরোগ ও রক্তচাপ: যে ইকোস্প্রিনের পাতা আগে ৬ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লোসারটান পটাশিয়াম (৫০ মি.গ্রা.) ৮ টাকা থেকে বেড়ে ১০-১৫ টাকা এবং অ্যামলোডিপাইন-অ্যাটেনোলোল ৬ টাকা থেকে বেড়ে ৮ টাকা হয়েছে।
অন্যান্য ওষুধ: অ্যান্টিবায়োটিক অ্যাজিথ্রোমাইসিন ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা, মন্টিলুকাস্ট ১৬ টাকা থেকে ১৭ টাকা ৫০ পয়সা, ফেক্সোফেনাডিন ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা এবং ভিটামিন বি-১, বি-৬ ও বি-১২ মিশ্রিত ট্যাবলেট ৭ টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকা প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে।
ওষুধের এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবার এখন বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খাবারের বাজেট কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই টাকার অভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাগুলোও করাতে পারছেন না। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ চলে যাওয়ায় সংসারের অন্যান্য জরুরি খরচ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
এদিকে খুচরা ফার্মেসি মালিকরা দাবি করেছেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের যে নতুন রেট বা গাইডলাইন দিয়েছে, তারা সেই নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ীই ওষুধ বিক্রি করছেন। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোম্পানিগুলো দাম বাড়ালে তাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়, আর কোম্পানি দাম কমালে বাজারেও ওষুধের দাম কমে আসবে।
রাজশাহীর স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে যখন ওষধের দাম বাড়ানো বা পুনঃনির্ধারণ করা হয়, তখন তা সারা দেশের জন্য একই সাথে কার্যকর হয়। সরকারের নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কোনো ফার্মেসির বাড়তি দাম নেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। রোগীদের অধিকার রক্ষায় জেলা প্রশাসন ও ড্রাগ সুপারের কার্যালয় নিয়মিত বাজার তদারকি ও ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে চলেছে। সুনির্দিষ্টভাবে কোথাও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।