তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ থেকে অফিশিয়ালি কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা চীন কেন বাংলাদেশ থেকে জাতীয় ফল কাঁঠাল নিতে আগ্রহী, তা নিয়ে বর্তমানে নানামুখী ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সফরে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ইকোনমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার অন্যতম অংশ এই কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে দেশের কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টি আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠালের শত কোটি ডলারের একটি বিশাল বৈশ্বিক বাজার রয়েছে, যা ২০১২ সালের ২০০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩ সাল নাগাদ ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর বৈশ্বিক রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে এককভাবে ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে ২৫ শতাংশ বাজার। অন্যদিকে, চীন হলো বিশ্বে কাঁঠালের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও আমদানিকারক দেশ। তারা তাদের চাহিদার সিংহভাগ ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করে মেটায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজারে দেশের অংশগ্রহণের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৭৬ শতাংশ যায় যুক্তরাজ্যের বাজারে এবং ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সসহ এই চার দেশেই মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশ চলে যায়। ফলে চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত ফলগুলোর মধ্যে আম প্রথম, কলা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কাঁঠাল। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক বাজার বা রপ্তানির সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর উৎপাদিত কাঁঠালের প্রায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি নষ্ট হয়ে যায়।
ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এ পর্যন্ত কাঁঠালের ছয়টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষকেরা গবেষণাগারে কাঁঠাল ব্যবহার করে ভেজিটেবল মিট, চিপস, আচার, জেলি, আইসক্রিম, কেক এবং ব্যাপক আলোচিত 'কাঁঠালসত্ত্ব' তৈরি করছেন। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কাঁঠালজাত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে বাংলাদেশেও এর ভালো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরাসরি প্রান্তিক কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করবে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ঢোকার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় কারিগরি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের টোটাল কৃষি খাতের রপ্তানি এখনো তেমন ভালো নয়। আমরা যতটুকু রপ্তানি করি, তার বেশির ভাগই নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ‘এথনিক মার্কেটে’ যায়। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি বা মান বজায় না থাকায় ইউরোপিয়ান মূল বাজারে আমরা এখনো ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারিনি।”
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “কাঁঠাল দিয়ে তৈরি পণ্য কয়েকটি দেশে ইতিমধ্যে রপ্তানি হচ্ছে, তবে চীন কীভাবে নেবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ কাঁঠাল সংরক্ষণ এবং দীর্ঘ পথ পরিবহনের ক্ষেত্রে কিছু প্রাকৃতিক ঝুঁকি রয়েছে।” তিনি মনে করেন, চীন যদি এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা বা বিনিয়োগ দেয়, তবে এই প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, চীনের সাথে এই সমঝোতা দেশের লোকাল মার্কেটে প্রযুক্তি শেখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য পাওয়ার লোভে যেন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও পুষ্টির (নিউট্রিশন) বিষয়টি অবহেলিত না হয়, সেদিকেও সরকারকে সমান নজর রাখতে হবে।