জুলাই বিপ্লবে সংগঠিত নজিরবিহীন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাজা আমৃত্যু কারাদণ্ড থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তর করার আপিল আবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দীর্ঘ সাত মাস ধরে শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউশন বিভাগের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও উদ্যোগের অভাবে মাসের পর মাস পার হলেও সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কজলিস্ট বা কার্যতালিকায় দফায় দফায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এই মামলার শুনানি শুরু করা সম্ভব হয়নি।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এই মামলার প্রথম রায় ঘোষণা করলেও, প্রসিকিউশন কর্তৃক দণ্ড বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর করা আপিলটির আইনি ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক এই মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত বছরের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল তার প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং আরেকটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে।
পরবর্তীতে এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করার আবেদন মঞ্জুর করা হয়। তদন্ত সংস্থা আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। বর্তমানে মামলার প্রধান দুই শীর্ষ আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক থাকলেও একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি সাবেক আইজিপি মামুন আদালতে 'অ্যাপ্রুভার' বা রাজসাক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের জন্য ৩০ দিন এবং তা নিষ্পত্তির জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। তবে আইনজ্ঞদের মতে, এই সময়সীমা নির্দেশনামূলক (ডাইরেক্টরি) হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হলেও আপিলের আইনি কার্যকারিতা নষ্ট হয় না।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত এই স্পর্শকাতর মামলার আপিল শুনানির জন্য পর্যাপ্ত ও অকাট্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারিনি। তাই তালিকায় আসলেও আমরা নিজ থেকে শুনানির উদ্যোগ নিইনি। তবে ৬০ দিনের আইনি সময়সীমা পার হলেও আপিলটি বাতিল বা এনফ্রেকচুয়াস হয়ে যাবে না, এটি পুরোপুরি বহাল থাকবে।” গত ১ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত বিষয়টি নিয়মিত বেঞ্চে পাঠালেও প্রসিকিউশন শুনানির জন্য দাঁড়ায়নি।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সাজা বা মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আদালতে যে আটটি প্রধান যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো— আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ শাস্তির বর্ণনায় প্রথমেই মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া জুলাই বিপ্লব দমনে সারা দেশে যে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন (Serious Human Rights Violation)।
যুক্তিতে আরও বলা হয়, আসামিরা মামলার ট্রায়াল ও সাজা সম্পর্কে অবগত থেকেও ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক রয়েছেন এবং বিদেশ থেকে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিবৃতি দিচ্ছেন। তাদের সরাসরি আদেশে দেশজুড়ে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যা ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘটনা।
তবে সামগ্রিক বিচারিক বিলম্বের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, শেখ হাসিনার মতো এমন একটি সংবেদনশীল মামলার শুনানির ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগের এক ধরনের অবহেলা ও স্পষ্ট অনাগ্রহ রয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”