২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অন্যতম তীব্র ও গভীরতম রাজনৈতিক ও দার্শনিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে এই অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করার একটি প্রাথমিক প্রবণতা দেখা গেলেও, বর্তমান রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও সমালোচকদের একটি বড় অংশ ভিন্ন মত পোষণ করছেন। তাদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইকে ১৯৭১ সালের সমার্থক করে দেখা হলে জুলাইয়ের প্রকৃত গুরুত্ব, দর্শন এবং এর অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষার প্রতি সঠিক বিচার করা হবে না। জুলাই বিপ্লব মূলত বাংলাদেশি রাষ্ট্র, তার সার্বভৌমত্ব, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং নাগরিকের প্রকৃত ন্যায়বিচার সম্পর্কে আমাদের চেনা ধারণাগুলোকে এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এর শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশ এই দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত পাকিস্তান আমল হয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। ১৯৭১ সালের পর আসা প্রতিটি সরকারই পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ও পুঞ্জীভূত ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি করেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এক জায়গায় কুক্ষিগত থাকা, আমলাতন্ত্রের সীমাহীন ক্ষমতা এবং জনগণের ওপর দমন-পীড়নকে নিয়মিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কারণে স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডগত মুক্তি এনেছে, কিন্তু জনগণের হাতে প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তা ছিল দশকের পর দশক ধরে চলে আসা পুরো রাজনৈতিক ও ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
কেন ২০২৪-কে ১৯৭১ থেকে আলাদা করে দেখতে হবে?
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল অত্যন্ত পবিত্র এবং বাঙালি জাতির হৃদয়ের গভীরতম স্থান। সেই যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল একটি বহিরাগত রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র তথা পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য ও মৌলিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সংগ্রামটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির—এটি ছিল বাংলাদেশের ভেতরের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। ফলে, ২০২৪ সালের জুলাইকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে ফেলা বা এক করে দেখা এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের তুলনা জুলাইয়ের বাস্তবতাকে ক্ষুণ্ণ করে এবং ১৯৭১-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনে আমাদের ব্যর্থতাগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
আবু সাঈদ: ক্ষমতার বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের প্রতীকী রূপ
এই আন্দোলনের প্রধান ও কালজয়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে শহীদ আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সেই অবিস্মরণীয় ছবি। বন্দুকধারী সুসজ্জিত পুলিশ বাহিনীর সামনে বুক টান করে দাঁড়ানোর এই অসীম সাহস কেবল আন্দোলনের কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় নীতিগত অবস্থান। সাংবাদিক ও পণ্ডিতদের মতে, আবু সাঈদের মৃত্যুর একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে বন্দুক ও বুলেটের চেয়েও মানুষের আত্মিক শক্তি অনেক বড় হতে পারে। নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আবু সাঈদ ক্ষমতার সেই মিথ্যা অহংকারকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন, যা স্বৈরাচারী সরকারগুলো মনে করত তাদের চিরস্থায়ী হাতিয়ার।
ভয়, ক্ষমতা ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন
যেকোনো আধুনিক স্বৈরাচারী রাষ্ট্র সাধারণত ভয়ভীতি প্রদর্শন, আইন, পুলিশ, কারাগার এবং দলীয় আনুগত্যের প্রলোভনের মাধ্যমে তার শাসনকাজ পরিচালনা করে। তবে জুলাইয়ের আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, যখন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মন থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের তৈরি করা ‘ভয়’ কেটে যায়, তখন এই প্রাচীন হাতিয়ারগুলো আর কাজ করে না। রাজনীতি মূলত শাসিতের সম্মতির ওপর টিকে থাকে। জুলাই মাসে যখন দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই স্বৈরাচারী সম্মতি দিতে অস্বীকার করেছে, তখনই রাষ্ট্র তার দমনমূলক ক্ষমতা হারিয়েছে। আন্দোলনকারীদের এই অকুতোভয় প্রস্তুতি রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এটিকে পরিণত করেছে আত্মিক মুক্তি ও মানবতাবোধ প্রতিষ্ঠার এক নতুন সংগ্রামে। যার মাধ্যমে ধর্ম, রাজনীতি ও জনজীবনের এক নতুন জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের পুনর্গঠন শুরু হয়েছে বাংলাদেশে।