দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিতে বড় ধরনের মন্থরতা দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার নেমে এসেছে বিগত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের মাত্র ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে। ফলে অর্থবছর শেষ হতে চললেও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক টাকাও খরচ করতে পারেনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
আইএমইডির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৩৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে সংশোধিত এডিপির প্রাক্কলিত আকার ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯াস্ট ৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মে মাস পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে এই বিশাল বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৭৬৩ কোটি টাকার কিছু বেশি।
বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় কমেছে প্রায় ১০ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। এমনকি বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালে দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন থাকার বছরেও (২০২০-২১ অর্থবছর) প্রথম ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। আইএমইডির সাধারণ হিসাব বলছে, গত দেড় দশকে এই নির্দিষ্ট সময়ে গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হতো, যা এবারই প্রথম ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া বড় ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বাস্তবায়নের দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
বরাদ্দ ব্যয়ে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স দেখিয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, যাদের খরচের হার মাত্র ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০ দশমিক ৪৫ শতাংশ বরাদ্দ ব্যবহার করতে পেরেছে। দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য খাতেও অগ্রগতি হতাশাজনক; যেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২৫ দশমিক Embedded শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে। অন্যদিকে মেগা প্রজেক্টের অন্তর্ভুক্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩৫ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ৪২ দশমিক ৪৬ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে।
এর বিপরীতে, উন্নয়ন ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। মূলত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ধারাবাহিক অগ্রগতির কারণে এই মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশে। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৮২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৭৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় ৬৮ দশমিক ৪১ শতাংশ বরাদ্দ ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের এই ঐতিহাসিক ধীরগতির পেছনে মূলত বেশ কিছু পদ্ধতিগত ও প্রশাসনিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও সিদ্ধান্তহীনতা।
অভ্যন্তরীণ ক্রয়প্রক্রিয়া বা টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব।
বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা ছাড়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা।
মাঠপর্যায়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) তীব্র ঘাটতি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।
অর্থনীতিবিদরা হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এডিপি বাস্তবায়নের এই শ্লথগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (GDP), নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থবছরের শেষ মাসে এসে তাড়াহুড়ো করে কাগজে-কলমে ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও, তা কাজের গুণগত মানকে ঝুঁকিতে ফেলে। তাই আগামীতে প্রকল্প তদারকি ও অর্থ ছাড়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা জরুরি।