বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক বড় ধরণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। বিগত সময়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতি-উত্সাহী ভূমিকা পালনকারী এবং বর্তমানে কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকা ডিআইজি থেকে শুরু করে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদমর্যাদার সর্বসাকুল্যে ৮০ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও সরকারি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব শীঘ্রই ক্রমান্বয়ে এই ৮০ কর্মকর্তার বরখাস্ত সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে। এই বিশেষ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখা থেকে একটি আদেশের মাধ্যমে ৩৩তম বিসিএসের মিশু বিশ্বাস, জুয়েল চাকমা এবং ৩৬তম বিসিএসের মাহমুদুল হাসানকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক নথিপত্র অনুযায়ী, চাকরিচ্যুত ও তালিকায় থাকা এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালীন দায়িত্ব পালনে অপেশাদার আচরণ, সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে বলপ্রয়োগ এবং অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। তালিকায় স্থান পাওয়া ৮০ জন কর্মকর্তার একটি বড় অংশ বর্তমানে সরকারি খাতায় 'অনুপস্থিত ও পলাতক' হিসেবে চিহ্নিত রয়েছেন। ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা কর্মস্থলে যোগদান না করায় দেশের বিভিন্ন থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, সাধারণ দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক আইনে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই তালিকায় সাবেক ডিএমপি কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দার এবং ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সাবেক রাজনৈতিক দলসমূহের কর্মসূচিতে অতিরিক্ত লাইভ বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের নির্দেশ প্রদান এবং দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও সাজানো মামলায় সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। দাপ্তরিক নথিতে জানানো হয়েছে, এসব কর্মকর্তার অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতির পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত, দুবাই কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
একই তালিকায় গাইবান্ধার ইন সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত এসপি এস এম শামীম, ডিএমপির সাবেক সহকারী কমিশনার গোলাম রুহানী এবং এএসপি মো. আরিফুজ্জামানের নাম রয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিশেষ করে রংপুরের আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সময় ফ্রন্টলাইনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে এএসপি আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান এবং সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি জায়েদুল আলমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ক্র্যাকডাউন পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকায় আরও যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—বিপ্লব বিজয় তালুকদার (ডিআইজি, পুলিশ টেলিকম), টুটুল চক্রবর্তী (অতিরিক্ত ডিআইজি), নূরে আলম মিনা (সাবেক ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ), সুদীপ কুমার চক্রবর্তী (যুগ্ম কমিশনার, ডিএমপি), মানস কুমার পোদ্দার (অতিরিক্ত ডিআইজি) এবং গোলাম মোস্তফা রাসেল (সাবেক এসপি, নারায়ণগঞ্জ)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। একই সাথে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিও উঠেছে।
এই সার্বিক বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের মোট ৮০ জন ক্যাডার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ও বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করে বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আরও বেশ কিছু কর্মকর্তার বরখাস্তের তালিকা বর্তমানে পাইপলাইনে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সবার বিরুদ্ধে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।”
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল রনি, সহ-সম্পাদক: আতাউর রহমান
যোগাযোগ: +𝟖𝟖 𝟎𝟗𝟔𝟗𝟕𝟓𝟎𝟏𝟎𝟏𝟎, বিজ্ঞাপন: +𝟖𝟖 𝟎𝟏𝟔𝟑𝟗 𝟑𝟏𝟑𝟏𝟑𝟏
১২২/৭, ব্লক–ডি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ।
স্বত্ব © ২০২৬ | দেশ এডিশন