পাঁচ দশক ধরে আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির বৃত্তে ঘুরছে সাপমারা খালের ওপর একটি সেতুর দাবি। মাত্র ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু না থাকায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে শত শত মানুষকে। খালের দুই পাড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলোর দৈনন্দিন জীবন যেন থমকে আছে এই একটি সেতুর অভাবে।
শঙ্খনদে মিলিত সাপমারা খালটি দুই ইউনিয়নকে বিভক্ত করেছে। দক্ষিণ সরেঙ্গা, উত্তর সরেঙ্গা, রায়পুর, পূর্ব গহিরা, জুঁইদণ্ডী, খুরুস্কুল, ভরাচরসহ অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো ব্যবহার করে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। বর্ষা মৌসুমে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়লে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়; অনেকেই খালে পড়ে আহত হন। এতে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা চরমে ওঠে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাঁকোটির অবস্থা এতটাই নড়বড়ে যে একসঙ্গে তিন-চারজনের বেশি মানুষ পার হতে পারেন না। প্রতি বছর এলাকাবাসী চাঁদা তুলে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করলেও বর্ষায় অনেক সময় নৌকাই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে। অর্ধশত বছরের এই প্রতীক্ষায় কেউ কিশোর থেকে যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধ হয়েছেন—তবু সেতু আর হয়নি।
দক্ষিণ খুরুস্কুল গ্রামের কৃষক শাহ আলম বলেন, “খালের এপার-ওপারে আমাদের অনেক চাষাবাদের জমি। সেতু না থাকায় ফসল ঘরে তুলতে ভয় আর কষ্ট দুটোই থাকে। ভোটের সময় সবাই আশ্বাস দেয়, কিন্তু সেতু আর দেখা যায় না।”
স্থানীয় কামাল উদ্দীন জানান, “সেতু নির্মাণের জন্য একাধিকবার পরিমাপ হয়েছে, প্রস্তাবও গেছে। কিন্তু চার যুগেও কাজ শুরু হয়নি।”
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সূত্র জানায়, সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত। উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহেদুল আলম চৌধুরী বলেন, “ওই স্থানে সেতু নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ মিললেই কাজ শুরু হবে।”
সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রার্থী সাপমারা খালের সাঁকো পরিদর্শন করেন। নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, “বিএনপি বৈষম্যহীন উন্নয়নে বিশ্বাসী। আমি আবারও এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। সাপমারা খালের ওপর সেতু নির্মাণ দ্রুত বাস্তবায়নে আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে।”
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন-এর ইউএনও তাহমিনা আক্তার জানান, স্থানীয়দের দুর্ভোগ বিবেচনায় সেতুটি জরুরি। প্রস্তাবনা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দেশজুড়ে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও একটি সেতুর অভাবে থমকে আছে এই জনপদের অগ্রযাত্রা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় অর্থনীতি—সবখানেই প্রভাব পড়ছে। এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা—সাপমারা খালের ওপর স্বপ্নের সেতু, যা বদলে দেবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার দিন, নিরাপদ করবে যাতায়াত, আর নতুন গতি দেবে জীবনের।