টানা কয়েক দিন ধরে লাশের খবরেই কাঁপছে সিলেট বিভাগ। কখনো মাজারের পুকুরে ভাসছে গলাকাটা মরদেহ, কখনো ঘরের তিরে ঝুলছে নববধূর দেহ। কেউ মারা যাচ্ছেন নামাজরত অবস্থায়, কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন সড়কে, আবার কেউ খুন হচ্ছেন নিজ বাড়িতে। কেউ বা নিখোঁজ হওয়ার পর মিলছে লাশ।
গত ৯ দিনে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জুড়ে উদ্ধার হয়েছে অন্তত ১৫টি লাশ— যার মধ্যে খুন, আত্মহত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরাও রয়েছেন। এক সময়ের শান্ত সিলেট এখন যেন অজানা ভয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বাড়ির আঙিনা, বাজার, সড়ক কিংবা মাজার— কোথাও নিরাপত্তা নেই, চারপাশে শুধু মৃত্যু ও আতঙ্কের ছায়া।
হবিগঞ্জের মাধবপুরে পরকীয়া সন্দেহে স্ত্রী শাপলা আক্তারকে (২৫) খুন করে আদালতে গিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন স্বামী রাজন মিয়া। একই দিনে সিলেটের ওসমানীনগরে তাজপুর বাজারের এক জুয়েলারি দোকানে স্বর্ণকার উজ্জ্বল বণিকের (৪৫) নিথর দেহ পাওয়া যায়।
এদিকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে এনা ও রয়েল কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনজন, আহত অন্তত ২৫ জন। সিলেটের শাহপরাণ মাজার পুকুরে পাওয়া গেছে হারুন মিয়া (৩০)-এর গলাকাটা মরদেহ।
ওসমানীনগরে একদিনে বাবা-মেয়েসহ তিনজন নিহত হন সড়ক দুর্ঘটনায়। মৌলভীবাজারের রাজনগরে জবা বিশ্বাস (২৫) নামের এক তরুণীর ঝুলন্ত দেহ মেলে বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যেই। কোম্পানীগঞ্জে পাথরবাহী ট্রাক্টরের চাপায় নিহত হন পর্যটক জিয়াউল হক (৬৫)। দক্ষিণ সুরমায় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাককে নিজ বাসার ছাদে হত্যা করা হয়— তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন।
এভাবে সিলেটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শুধু মৃত্যু সংবাদ। জালালাবাদে সৌদি ফেরত যুবক খাইরুল ইসলামের লাশ, গোয়াইনঘাটে আল-আমীন হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার ৬ জন, খাদিমনগরে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি। হবিগঞ্জের মাধবপুরে দুই সন্তানের জননী সানজিদা আক্তার নিপা (৩০)-এর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়, পরিবার বলছে— এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা। কানাইঘাটে প্রতিপক্ষের হামলায় খুন হন আব্দুল হান্নান ওরফে হানাই।
জৈন্তাপুরে আমগাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় সাইদুল ইসলামের (২২) মরদেহ, একই উপজেলায় সিএনজি থেকে পড়ে প্রাণ হারান হারুন অর রশিদ (৫০)। নবীগঞ্জে জুমার নামাজের সময় মসজিদেই ছুরিকাঘাতে নিহত হন এক মুসল্লি।
এই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর ও মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন,
“প্রতিটি ঘটনা তদন্তাধীন। কিছু দুর্ঘটনা, কিছু হত্যাকাণ্ড ও রহস্যজনক মৃত্যু। প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, অপরাধীরা কেউই আইনের বাইরে থাকবে না।”
গত ৯ দিনে সিলেট বিভাগে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু যেন এক শীতল বার্তা দিচ্ছে— কোথাও নিরাপত্তা নেই। প্রশাসন বলছে, তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবু জনমনে প্রশ্ন— এই মৃত্যুর মিছিল কবে থামবে?