চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে লালদিয়ারচর কনটেইনার টার্মিনাল এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী—
পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালের অপারেশন দায়িত্ব সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেডলগ আগামী ২২ বছরের জন্য গ্রহণ করছে।
লালদিয়ারচর টার্মিনালের অপারেশন দায়িত্ব ডেনমার্কভিত্তিক এপি মোলার মায়ের্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস আগামী ৩০ বছরের জন্য পরিচালনা করবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেন মেডলগ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এটিএম আনিসুল মিল্লাত এবং এপিএম টার্মিনালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টেইল ভ্যান ডোঙ্গেন।
লোকাল এজেন্ট নিয়োগ ও বিতর্ক
বন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশে একাধিক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান লোকাল এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা গেছে। সূত্র দাবি করেছে, এসব এজেন্টের সঙ্গে অতীত রাজনৈতিক প্রভাব বা কাছাকাছি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নিয়ে বন্দর অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি—এজেন্ট নির্বাচন হয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের “ব্যবসায়িক মূল্যায়ন” এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে জিটুজি (G2G) প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।
পানগাঁও টার্মিনালের দীর্ঘদিনের লোকসান
২০১৩ সালে চালুর পর থেকে পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল ধারাবাহিকভাবে লোকসান দেখছে। বন্দর কর্মকর্তাদের ভাষ্য—ঢাকার শিল্প ও ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ টার্মিনাল ব্যবহারে আগ্রহী না হওয়ায় এবং সহযোগী অবকাঠামো পূর্ণাঙ্গ রূপে গড়ে না ওঠায় এই লোকসান বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ রয়েছে যে, পূর্ববর্তী সরকার পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত না করায় টার্মিনাল তার সম্ভাবনা অনুযায়ী ব্যবহার হয়নি।
তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন, বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত ও সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অভিজ্ঞতা যুক্ত হওয়া ইতিবাচক হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি জনগণের সামনে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলে আস্থা আরও বাড়ত।
বন্দর কর্তৃপক্ষের অবস্থান
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানিয়েছেন—
অপারেটর নিয়োগ সম্পূর্ণ টেন্ডারভিত্তিক এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কোম্পানিগুলোই নির্বাচিত হয়েছে।
লোকাল এজেন্টরা কেবল প্রিন্সিপাল প্রতিষ্ঠানের কিছু দাপ্তরিক কাজ করে থাকে, অপারেশন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের নেই।
তিনি বলেন, বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত মূলত সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনাল ইতোমধ্যে বিদেশি অপারেটরদের অধীনে গেছে। এর ফলে পরিচালনাগত উন্নয়ন ঘটবে বলে আশাবাদী বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বিভিন্ন সূত্রের দাবি—লোকাল এজেন্টদের মালিকানা ও পুরনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যে আলোচনাগুলো সামনে এসেছে, তা বন্দর ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন থাকছে।