ডাউকি ফল্টে চাপ বাড়ছে: বড় ভূমিকম্পে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পুরো সিলেট

আতাউর রহমান | সিলেট ব্যুরো, দেশ এডিশন
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে আবারও সতর্কবার্তা মিলেছে সিলেটকে ঘিরে। মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন সক্রিয় ডাউকি ফল্টের নিকটবর্তী হওয়ায় এ এলাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ১৩০ বছর ধরে ফল্ট লাইনে জমে থাকা চাপ বড় মাত্রার ভূকম্পন ডেকে আনতে পারে, যা সিলেটে ব্যাপক ধস ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

সিলেটের অবস্থান ডাউকি, সিলেট ও ত্রিপুরা—এই তিন সক্রিয় ফল্টের নিকটে হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটেছিল এই ফল্টেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘন ঘন মৃদু কম্পন স্থানীয় ফল্টগুলোর সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন ভূতাত্ত্বিকরা।

নগরীতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অনিয়মিত ভবন নির্মাণ। সিলেট নগরীর অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও এসব ভবনের বড় অংশ ধসে পড়তে পারে। পুরোনো ও দুর্বল ভবনগুলোর অবস্থাও নাজুক। সিসিকের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে নগরীতে ২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে, যার মধ্যে নয়টি ভবনকে প্রাথমিকভাবে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শনাক্ত করেছেন শাবিপ্রবির প্রকৌশলীরা।

তবে এসব ভবনের পূর্ণাঙ্গ জরিপ স্থগিত আছে মালিকদের অনাগ্রহের কারণে। জরিপে অর্থায়নের দায়িত্ব নিতে না চাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ডিটেইলড অ্যাসেসমেন্ট করা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেট্রোফিটিংসহ কাঠামোগত শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রতিটি ভবনের বিস্তারিত মূল্যায়ন জরুরি; অন্যথায় ঝুঁকি থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।

শাবিপ্রবির অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমদ এর ভাষ্যমতে, ডাউকি ফল্টের অস্থিরতা সিলেটের জন্য বড় হুমকি। ভবন নির্মাণে তৃতীয় পক্ষের ভেটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। একই মতামত শাবিপ্রবির সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলমেরও। তিনি বলেন, ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সিলেটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। এজন্য ভবন কোড বাস্তবায়ন, ইভাকুয়েশন ম্যাপিং, ভলান্টিয়ার প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ জরুরি।

সিসিকের প্রকৌশলীদের দাবি, বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করেই ভবন অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে আবেদনকারীদের লিখিত ‘ভূমিকম্প প্রতিরোধী’ সনদ জমা দিলেই অনুমোদন মিলছে—যা যাচাই করার সক্ষমতা সিসিকের নিজস্ব জনবলে নেই।

ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্প্রতি সিসিকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় নগরীর সব চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও সিসিক প্রশাসক খান মো. রেজা-উন-নবী জানান, নগরবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সব ভবন অপসারণ করা হবে এবং নতুন করে অ্যাসেসমেন্ট করে অতিরিক্ত ভবন থাকলে সেগুলোকেও ভাঙা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের অবস্থান ও অব্যবস্থাপনার কারণে শহরটি যে কোনো সময় বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়োপযোগী পরিকল্পনা, ভবন কোড বাস্তবায়ন এবং জরিপ কাজ দ্রুত সম্পন্নই পারে সিলেটকে বড় ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে।

error: Content is protected !!