অন্তর্বর্তী বা ইন্টারিং সরকারকে নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণকে নির্দেশ করে। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের দায়িত্ব ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে এই সরকারের ভূমিকা নিরপেক্ষ, সময়সীমাবদ্ধ এবং সীমিত ক্ষমতার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং অংশগ্রহণের পরিধি নিয়ে নানান বিতর্ক ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—যা কেবল নির্বাচন নয়, বরং ভবিষ্যৎ সরকারকেও একটি জটিল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার উপহার দিতে পারে।
ইন্টারিং সরকার কোনোভাবেই “নীতিনির্ধারক” সরকারের ভূমিকা পালন করার কথা নয়। এর কাজ হলো—নির্বাচন কমিশনের সাথে সমন্বয় করে একটি বিশ্বাসযোগ্য ভোট আয়োজন করা, যাতে সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের আস্থা থাকে। কিন্তু যখন এই সরকারের সিদ্ধান্তগুলো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা নির্বাচনী পরিসর সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়, তখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যিই নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো, নাকি এটি ক্ষমতার হস্তান্তরের আগে আরেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ?
যদি সব দলকে সমানভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে নির্বাচনের বৈধতা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিসরে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো অংশগ্রহণ; আর অংশগ্রহণহীন গণতন্ত্র কেবল একদলীয় আনুষ্ঠানিকতা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি বড় অংশ বঞ্চিত হয়, তখন পরবর্তী সরকার তার নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলে, এমনকি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাও ব্যাহত হয়।
নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পরবর্তী সরকার যদি একটি সীমিত ও বিতর্কিত প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসে, তবে তার প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে বৈধতার সংকট মোকাবিলা করা। জনআস্থা পুনর্গঠন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা, এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি—এসব হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে কঠিন কাজ। এছাড়া, যে রাজনৈতিক দমননীতি বা কঠোরতা ইন্টারিং সরকারের আমলে প্রয়োগ করা হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়াও দীর্ঘমেয়াদে দেখা দিতে পারে। বিরোধী দলগুলো যদি রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠিত হয়, তবে রাজপথে নতুন করে আন্দোলন শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও অস্বীকার করা যায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় অভাব হলো—আস্থার পরিবেশ ও জাতীয় ঐকমত্যের সংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনা, ন্যূনতম একটি নির্বাচনী ঐকমত্য সৃষ্টি করা। কিন্তু রাজনৈতিক সংলাপের অনুপস্থিতি নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। ভবিষ্যৎ সরকার যদি স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে চায়, তবে তাকে এই সংলাপের রাজনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নয়, বরং অংশগ্রহণের বিস্তার থেকে।
বাংলাদেশের জনগণ এখন ক্লান্ত—সংকটের পুনরাবৃত্তি, সংঘর্ষের রাজনীতি, ও অবিশ্বাসের চক্রে। পরবর্তী সরকার যদি এই দেশকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে কেবল অর্থনীতি নয়, গণতন্ত্রের আস্থার ভিতও পুনর্গঠন করতে হবে। ইন্টারিং সরকারের কঠোরতা ও রাজনৈতিক বর্জন যদি আবারও বিভক্ত সমাজের জন্ম দেয়, তবে সেটি হবে একটি “নত ক্রাইসিস”—একটি এমন রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থা, যেখানে উন্নয়ন, ন্যায় ও গণতন্ত্র—সবই প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়। সুতরাং, ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবে আজকের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তের ওপর—নিরপেক্ষতা, সংলাপ ও ন্যায়ভিত্তিক প্রক্রিয়া ছাড়া তার কোনো বিকল্প নেই।