আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন তৎপরতা বাড়ছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাঠের রাজনীতিতে সুবিধা করতে না পেরে একটি চিহ্নিত মহল এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অপপ্রচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে ভুয়া নথি, জাল লেটারহেড এবং এআই প্রযুক্তিতে তৈরি তথাকথিত “ডিপফেইক” কনটেন্ট ছড়িয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি কথিত ‘গোপন নথি’তে দাবি করা হয়, একটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা নাকি একটি রাজনৈতিক দলকে ৭৫ শতাংশ ভোট পাইয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
তবে নথিটি বিশ্লেষণ করে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। বানান ভুল, অস্বাভাবিক ফন্ট, অসংলগ্ন স্মারক নম্বর এবং সংস্থাপ্রধানের ঠিকানায় সংস্থার নিজস্ব নির্দেশনা পাঠানোর মতো অযৌক্তিক উপাদান এতে রয়েছে—যা বিশেষজ্ঞদের মতে জালিয়াতির স্পষ্ট লক্ষণ।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ভুয়া ওই নথিটি প্রথম সামাজিক মাধ্যমে ছড়ান সুব্রত কুমার সরকার নামে এক ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তার পোস্টের পর নিষিদ্ধ কার্যক্রমে যুক্ত একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ কয়েকটি পেজ ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট একই কনটেন্ট কপি-পেস্ট করে ছড়িয়ে দেয়। অতীতেও সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর নামে ভুয়া চিঠি প্রচারের অনুরূপ কৌশল লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অপতথ্য ছড়ানোর ধাপগুলো সাধারণত একই রকম—প্রথমে ভুয়া লেটারহেড বা নথি তৈরি, এরপর সমন্বিতভাবে বিভিন্ন ফেসবুক ও এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে তা ছড়িয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অ্যাকাউন্ট দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ভুয়া নথিতে সাধারণত দেখা যায়—
বানান ও ভাষাগত ভুল
সরকারি কাজে ব্যবহৃত নয় এমন ফন্ট
অস্বাভাবিক স্মারক নম্বর বা সিল
অসংগত প্রেরক-প্রাপক তথ্য
এসব লক্ষণ দেখলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এবারের ভোট আয়োজনকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্যও পরিবেশ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, অপতথ্যকে হালকাভাবে নিলে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। তাই সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল আচরণই হতে পারে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান উপায়।
সারকথা: নির্বাচনকে ঘিরে অপপ্রচার নতুন কিছু নয়, তবে প্রযুক্তিনির্ভর ভুয়া কনটেন্টের যুগে নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।