বিএনপি–জামায়াত–এনসিপিকে গোলকধাঁধায় ফেললেন ড. ইউনূস

দেশ এডিশন রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্তে বহুদলীয় রাজনৈতিক দাবির কোনটি মানা হলো, কোনটি উপেক্ষিত হলো—এ নিয়ে BNP, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

সরকার দলগুলোকে মতভিন্নতা কাটিয়ে ৭ দিনের মধ্যে সমন্বিত প্রস্তাব দিতে বলেছিল। কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার খবর পাওয়া যায়নি। তাই আদেশ জারি হওয়ার পর মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—ড. ইউনূসের সরকার দলগুলোর আপত্তি ও প্রস্তাব কতটুকু বিবেচনায় নিয়েছে?

১. আদেশ নাকি প্রজ্ঞাপন—BNP–জামায়াতের বিভক্ত অবস্থান

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি নিয়ে আপত্তি ছিল বিএনপির। তাদের দাবি ছিল — এটি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা উচিত। অন্যদিকে জামায়াত ছিল আদেশের পক্ষে। শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত গেছে জামায়াতের দাবির পক্ষে, বিএনপির দাবি উপেক্ষিত।

২. ভোট একসঙ্গে—BNP পেল, জামায়াত পেল না

বিএনপি চেয়েছিল:

  • ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ার দাবি পূরণ হোক।
    সরকার তা মেনেছে। তবে জামায়াত চেয়েছিল নির্বাচনের আগে গণভোট—সে দাবি মানা হয়নি।

৩. উচ্চকক্ষ গঠন—BNP-এর প্রস্তাব বাতিল, মান পেল জামায়াত–এনসিপি

উচ্চকক্ষ গঠনে বিএনপি চাইছিল:

  • ১০০ আসন বণ্টন হোক নিম্নকক্ষের আসন-বন্টনের ভিত্তিতে।
    সরকার এটি গ্রহণ করেনি।

জামায়াত ও এনসিপি চাইছিল:

  • সংখ্যানুপাতিক (PR) ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন।
    এ দাবিই বাস্তবায়ন হলো।

৪. সংবিধান সংশোধনেও BNP-এর আপত্তি আমলে নিল না সরকার

উচ্চকক্ষে ৫১ শতাংশ ভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিধানেও আপত্তি জানিয়েছিল বিএনপি।
কিন্তু সরকারের আদেশে সেই বিধানই রাখা হয়েছে।

৫. নোট অব ডিসেন্ট—আংশিক স্বীকৃতি পেল বিএনপি

বিএনপি চাইছিল:

  • ভিন্নমত অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুযোগ।
    সরকার আংশিক স্বীকৃতি দিলেও মূল দাবি—দুদক, পিএসসি, ন্যায়পাল নিয়োগ ইত্যাদিতে বিএনপির যুক্তি গৃহীত হয়নি।

বিশেষ করে দুদক নিয়োগে বিএনপি আইনের মাধ্যমে নিয়োগ চাইলে সরকার রাখে:

  • বাছাই কমিটি → নাম প্রস্তাব করবে

  • রাষ্ট্রপতি → নিয়োগ দেবেন

৬. তত্ত্বাবধায়ক সরকার—গঠন পদ্ধতিতে ভিন্নমত উপেক্ষিত

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণায় বিএনপি এক হলেও গঠনের পদ্ধতিতে তাদের প্রস্তাব মানা হয়নি।

৭. স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব বাতিল

এনসিপির দৃঢ় অবস্থান ছিল—জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের দাবি আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হলেও:

ঐকমত্য কমিশনের একটি সুপারিশে বলা হয়েছিল—
▪️ ২৭০ দিন পেরিয়ে গেলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যোগ হবে।
এ নিয়ে BNP আপত্তি করে এবং সরকারও তা বাদ দিয়েছে।

৮. আদেশে কার নাম থাকবে—রাষ্ট্রপতি না প্রধান উপদেষ্টা?

এনসিপি চাইছিল:

  • আদেশটি জারি করুন প্রধান উপদেষ্টা, কারণ রাষ্ট্রপতির প্রতি তাদের অনাস্থা ছিল।
    কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত—

  • আদেশ জারি হবেন রাষ্ট্রপতি—সংবিধান অনুযায়ী তিনিই তা করতে পারেন।

৯. দ্বৈত ভূমিকা—জামায়াত–এনসিপির দাবি পূরণ

জামায়াত ও এনসিপি চাইছিল:

  • নতুন সংসদ → সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে।
    সরকার সেটি মানলো।
    কিন্তু বিএনপি ছিল এই প্রস্তাবের বিপক্ষে।

কোথা থেকে এল এই দ্বন্দ্ব?

১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলো ড. ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে।
২৮ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার রিপোর্ট জমা দিলে দেখা যায়—
▪️ স্বাক্ষরিত সনদের সঙ্গে গণপরিষদের রিপোর্টে ফারাক রয়েছে।
এতে পুনরায় রাজনৈতিক অনৈক্য দেখা দেয়।

অবশেষে সমাধানের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল তার নতুন ইনোভেটিভ পদ্ধতি জাতির সামনে হাজির করেন।

সার্বিক চিত্র

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে:

  • জামায়াত ও এনসিপির বেশকিছু দাবি পূরণ হয়েছে,

  • অপরদিকে BNP-এর বড় বড় আপত্তিগুলো উপেক্ষিত হয়েছে,

  • কিছু বিষয়ে আংশিক ছাড় পেলেও মূল রাজনৈতিক অবস্থানগুলোতে সমঝোতা হয়নি।

ড. ইউনূসের এই সিদ্ধান্ত এখন দেশের রাজনৈতিক মাঠকে নতুন এক গোলকধাঁধায় ফেলেছে—
আগামী নির্বাচন ও গণভোটের আগে এই বিতর্ক আরও জোরালো হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

error: Content is protected !!