ভেনেজুয়েলার নতুন অধ্যায়

উপসম্পাদকীয়: -Π আতাউর রহমান
প্রকাশ: ১ মাস আগে

৩ জানুয়ারি ২০২৬-এ ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক বিরাট ভূপট পরিবর্তন ঘটে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দেশটির ওপর আঘাত চালানোর প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাটি শুধু একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক খণ্ডচিত্র নয়; এটি ২১শ শতাব্দীর বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ, শক্তির রাজনীতি ও আধুনিক বিশ্বকৌশলের একটি গঠনমূলক প্রতিশ্রুতি।

● ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা:
ভেনেজুয়েলা বহু বছর ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সঙ্গেই লড়াই করেছে। মাদুরোর শাসনামলে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক বিভাজন ও মানবাধিকার সংকটে ভুগেছে; অনেক বিরোধীরা তাকে স্বৈরশাসী হিসেবে বিবেচনা করেন এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পরে বিরোধিতা তীব্র হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা কাঠামোর দুর্বলতা, রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বাড়তি সন্দেহ, এবং জনগণের মধ্যে হতাশা মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশীয় অস্থিরতার। এই অস্থিরতা সহজেই বাইরে থেকে প্রভাবিত হতে পারে—বিশেষত যখন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক আগ্রহ সামনে রাখে।

● বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের বিবর্তন: আধুনিক মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ইতিহাসে আমেরিকার হস্তক্ষেপ নতুন নয়; ২০শ শতাব্দীর মধ্যেই লাতিন আমেরিকায় একাধিক দেশ— যেমন প্যানামা ও গ্রেনাডা—-তে মিলিটারি অভিযান আরেক রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক রদবদলের জন্য চালানো হয়েছিল। ৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনা সেই ধারারই এক আধুনিক আবির্ভাব, যেখানে কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের পরিবর্তে সরাসরি সৈন্য ও আকাশ থেকে আঘাতের নজির সৃষ্টি হল।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বলা হয়, তারা ‘ভেনেজুয়েলার তেল ও সম্পদের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করবে এবং দেশটিকে “সঠিকভাবে পরিচালনা” করবে যতক্ষণ না শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার রদবদল হয়। এটি একটি কান্ডারি রূপ ধারণ করেছে যেখানে জাতিস্বাতন্ত্র্য বনাম শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থের সংঘাত সামনে চলে এসেছে।

এই পরিবর্তন কেবল দায়েরি নয়; এটা প্রমাণ করে যে সাম্রাজ্যবাদ পরম্পরাগত অস্ত্রের প্রতিস্থাপন করে আধুনিক কৌশলে— যেখানে বিদেশি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, শক্তির প্রদর্শনী, ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নীতির লালন আরও সূক্ষ্মভাবে মিশে যাচ্ছে।

● আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক কৌশল
যদিও কিছু দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের অপসারণকে স্বাগত জানিয়েছে, অনেকেরই প্রতিক্রিয়া হয়েছে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ-জনক: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠকের ডাক, বিভিন্ন দেশ বলেছে এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি আক্রমণ। চীনের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র ‘মার্কিন আগ্রাসন’ নিন্দা করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিওন, ফ্রান্সের মতো দেশ বলেছে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না যদি না তা দেশীয় জনগণের ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়।

এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নির্দেশ করে যে আজকের বিশ্বে শক্তির রাজনীতি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শনী নয়; রাজনৈতিক বৈধতা, কূটনৈতিক সহমত আর আন্তর্জাতিক আইনের সীমানা এখন শক্তি সংঘাতের ক্ষেত্রেও নির্ণায়ক ফ্যাক্টর।

● ভবিষ্যৎ কি?
ভেনেজুয়েলার এই মুহূর্তের পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জাতিস্বাতন্ত্র্য, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক নীতির আদর্শ আজও কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা যতই জটিল হোক, এর সমাধান নিজ দেশের জনগণের হাতে থাকা উচিত—not বিদেশি জবরদস্তি ও হস্তক্ষেপের মাধ্যমে।
এটি রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যেখানে শক্তির সর্বোচ্চ স্তরগুলো নিজেদের স্বার্থে নির্ধারণ করছে অন্য একটি দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল ও ন্যায্য সমাধান পেতে হলে কূটনৈতিক পথে অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও দেশের জনগণের ইচ্ছার সম্মানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে।

error: Content is protected !!