আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। তবে নির্বাচনি মাঠে দুই ভোটের প্রচারে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনে জোরালো প্রচার থাকলেও গণভোট নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দলের মধ্যে দৃশ্যমান অনাগ্রহ দেখা গেছে। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হ্যাঁ’ অবস্থানে থাকার ঘোষণা দিলেও মাঠ পর্যায়ে বিএনপির প্রচারে রয়েছে নীরবতা, যা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
দলীয় সূত্র ও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে গণভোট নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় অনেক স্থানে বিএনপি নেতাকর্মীরা কেবল দলীয় প্রতীক ধানের শীষে ভোট চাইছেন, গণভোট প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন। ভোটারদের প্রশ্নের মুখে পড়ে কেউ কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বললেও তা সংগঠিত প্রচারে রূপ নেয়নি। কোনো কোনো এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ‘না’ ভোটের নীরব প্রচারের অভিযোগও উঠেছে, যদিও এটি দলীয় সিদ্ধান্ত কিনা তা নিশ্চিত নয়।
বিএনপির কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এক জনসভায় বলেন, সংস্কারের বিপক্ষে বিএনপি নয়। একই কথা বলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় জনসভাগুলোতে গণভোট প্রসঙ্গ প্রায় অনুপস্থিত থাকায় বিভ্রান্তি কাটছে না।
দলটির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করলেও পরবর্তীতে সনদে পরিবর্তন ও নোট অব ডিসেন্ট বিবেচনায় না নেওয়া নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। গণভোটের প্রশ্নের বিষয়বস্তু নিয়েও তাদের অসন্তোষ আছে। এ কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হ্যাঁ’ অবস্থানে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় প্রচারে আগ্রহী নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে দেশজুড়ে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। নির্বাচনি সভা, গণসংযোগ, লিফলেট, ব্যানার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানানো হচ্ছে। জোটভুক্ত অনেক প্রার্থী তাদের প্রচারপত্রে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি গণভোটের কথাও উল্লেখ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার জনসভাগুলোতে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে “জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার রায়” হিসেবে উল্লেখ করছেন। এনসিপি ২৭০ আসনে প্রতিনিধি নিয়োগ করে গণভোটের পক্ষে পৃথক প্রচার কাঠামো গঠন করেছে। দলটি লিফলেট বিতরণ, পথসভা ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারও গণভোটের পক্ষে সচেতনতা বাড়াতে সক্রিয় রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও উপদেষ্টারা দেশব্যাপী সফর করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চলছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ও কয়েকটি দল সরাসরি ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন,
“রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত গণভোটের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। দলগুলো নীরব থাকলে তরুণ ভোটারদের মধ্যে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে।”
নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও বিএনপির তৃণমূলে গণভোট নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে ভোটের মাঠে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—এই দুই ইস্যুর প্রচারে বৈষম্যই এখন বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।