মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিতে দ্বন্দ্ব বাড়ছে, সংঘাত থামাতে দলীয় হস্তক্ষেপের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বিশেষ প্রতিবেদন | দেশ এডিশন
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ইতোমধ্যে ২৩৭ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু মনোনয়ন প্রকাশের পর থেকেই দলের ভেতরে অস্বস্তি ও বিরোধ চরমে উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষোভ, মশাল মিছিল, মানববন্ধন থেকে শুরু করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এমনকি মনোনয়ন ঘিরে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল আসন্ন নির্বাচনে মূল্যায়িত হওয়ার। কিন্তু মনোনয়ন বঞ্চনার ক্ষোভই এখন অনেক জায়গায় সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।

 গৌরীপুরে সংঘর্ষে নিহত

গত রোববার ময়মনসিংহের গৌরীপুরে বিএনপির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্রদলকর্মী তানজিন আহমেদ আবিদ (৩০)। মধ্যবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 সারাদেশে বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ

মনোনয়ন ঘোষণার পর চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, সিলেট, নাটোর, খুলনা, ঠাকুরগাঁও, জামালপুরসহ ২৫টিরও বেশি জেলায় বিক্ষোভ, পাল্টা মিছিল ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় সম্ভাব্য প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে তৃণমূল নেতাকর্মীরা মঞ্চে উঠেছেন।

ফেনী সদর আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে ক্রিকেট স্টাইলে ‘রিভিউ আবেদন’ করে আলোচনায় এসেছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল। তার অভিনব প্রতিবাদ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

অন্যদিকে মাদারীপুর-১ আসনে বক্তৃতার শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় প্রার্থীতা হারিয়েছেন কামাল জামান মোল্লা, যা নিয়ে দলে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।

 বিতর্কিত প্রার্থীদের নিয়ে ক্ষোভ

দলীয় ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, কিছু আসনে এমন প্রার্থীর নাম এসেছে যারা বহু বছর ধরে রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন বা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। যেমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে ৯০ বছর বয়সী সাবেক সচিব ও কানাডা প্রবাসী মুশফিকুর রহমানকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

 টাঙ্গাইল-৩ এ আন্দোলন অব্যাহত

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম ওবায়দুল হক নাসিরের সম্ভাব্য মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদের অনুসারীরা লাগাতার বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা ঘোষণা দিয়েছেন—মনোনয়ন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

আজাদ বলেন, “৩৭ বছর ধরে দলের সঙ্গে আছি। এই মনোনয়ন নিয়ে আপাতত কিছু বলছি না। তবে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলেই মনে হয়। দল যদি বিবেচনা করে পরিবর্তন আনে, সেটি দলের সিদ্ধান্ত।”

 বিশ্লেষকদের পরামর্শ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ দেশ এডিশনকে বলেন,

“বিএনপির সহানুভূতিশীল হওয়ার সুযোগ আছে। দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীরা মনোনয়ন চাইবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দল সবাইকে দিতে পারবে না। সমঝোতা, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যদি দল সংঘাত নিরসন করতে পারে, সেটাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।”

তিনি আরও বলেন,

“মনোনয়নবঞ্চিতদের অবদানকে স্বীকার করতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা না গেলেও, বোঝানোর মধ্য দিয়েই দল ঐক্য ফিরিয়ে আনতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্রোহী প্রার্থীকেও দলকে সহনশীলভাবে মোকাবিলা করতে হবে।”

 দলের অবস্থান

বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘোষিত তালিকা “সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা”—চূড়ান্ত নয়। তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবতা বিবেচনায় কিছু আসনে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দলীয় নীতিনির্ধারকেরা।


দেশ এডিশন বিশ্লেষণ:
মনোনয়ন রাজনীতি সবসময়ই সংবেদনশীল। বিশেষত দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিএনপির মতো একটি দলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দলীয় ঐক্য রক্ষা করা। নির্বাচনের আগে যদি এই মনোনয়ন-সংঘাত নিরসনে দল সফল হয়, তবে সেটিই হতে পারে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে বিএনপির প্রথম সাফল্য।

error: Content is protected !!