সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে অতিরিক্ত মূল্য গুনে কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও কোথাও পটাশ সার একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সরিষা ও আলুসহ বিভিন্ন রবিশস্য চাষে চরম বিঘ্ন ঘটছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
যদিও সরকারের দাবি, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সংকট বা দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই; কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু ডিলার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দরিদ্র কৃষকদের পকেট কাটছে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার কৃষক মোকলেছুর রহমান বলেন, “সার কেনার জন্য দোকানে গেলে ডিলারের কাছে যেতে বলে। আবার ডিলার স্লিপ চায়, স্লিপ নিয়ে গেলে বলে সার নেই বা বেশি দামে দেয়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামেই কিনতে হচ্ছে।”
একই এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “টাকা হাতে নিয়েও সার পাচ্ছি না। দামের কারণে এখনো জমিতে সার দিতে পারিনি।”
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, সরকার ডিলারদের কাছে টিএসপি ২৫, ডিএপি ১৯ ও এমওপি ১৮ টাকা দরে বিক্রি করছে, যেখানে ডিলারদের দুই টাকা লাভে কৃষকের কাছে বিক্রি করার কথা। এতে সরকার প্রতি কেজিতে ৫৫ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কৃষকরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৮–১০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরকারি নির্ধারিত ৫০ কেজি টিএসপি সারের দাম ১,৩৫০ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২,১০০ টাকায়। একইভাবে ডিএপি ১,০৫০ টাকার পরিবর্তে ১,৪০০ টাকায়, ইউরিয়া ১,৩৫০ টাকার পরিবর্তে ১,৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমওপি বিক্রি হচ্ছে ১,১০০ টাকায়।
ডিলারদের কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে রাজশাহী, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রবিশস্য চাষে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা বরাদ্দ পাওয়া সার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন এবং অনেকেই গুদামে মজুত রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
সম্প্রতি পাটগ্রামের বাইপাস মোড়ে ৪১৬ বস্তা সার অবৈধভাবে বিক্রির সময় জব্দ করেছে বিসিআইসি। উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযুক্ত ডিলারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এছাড়া বিজিবি ও কৃষি বিভাগের অভিযানে জেলার বাইরে পাচারের সময় আরও ১৯৩ বস্তা সার জব্দ করা হয়।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অলিউর রহমান বলেন, “এ সংকটের জন্য কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই দায়ী। তারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করছেন।”
অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া বলেন, “দেশে সারের সংকট থাকবে না। সার নিয়ে সমস্যা ছিল, তবে এখন থেকে ডিলারদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।”
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, “সরকারি বরাদ্দে কোনো সংকট নেই, তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিমুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে সার ডিলারদের দাবি, তারা চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাচ্ছেন, ফলে এক সপ্তাহেই দোকানের সব সার শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিএডিসি সার ও বীজ ডিলার অ্যাসোসিয়েশন “সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা–২০২৫” দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ সোহেল বলেন, “পুরনো নীতিমালার (২০০৯) কারণে আজকের এই সংকট। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে বৈষম্য ও জটিলতা দূর হবে।”
প্রসঙ্গত, দেশের সার সিন্ডিকেট ভাঙতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যা আগামী জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।