বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু ভূগোলের সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়—এ সম্পর্ক ইতিহাস, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে সত্য এটিও—সৌহার্দ্য কখনোই আত্মসম্মানের বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আঘাত আসলে রাষ্ট্রকে তা দৃঢ় ও যুক্তিসঙ্গত কূটনৈতিক জবাবে প্রতিফলিত করতে হবে।
সম্প্রতি নানা ইস্যুতে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে—সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, বাণিজ্যগত ভারসাম্য, নাগরিক মর্যাদা, আঞ্চলিক কূটনীতি—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ চায় রাষ্ট্র স্পষ্ট অবস্থান নিক। জনগণের এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান ও সমতা। কোনো সম্পর্ক যদি একতরফা সুবিধা বা চাপের দিকে ধাবিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার—
জাতীয় স্বার্থে প্রশ্নে আপস নয়,
কূটনৈতিক ভাষায় দৃঢ়তা,
তথ্যভিত্তিক ও প্রমাণসমৃদ্ধ প্রতিক্রিয়া,
আলোচনা ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সমস্যা সমাধান।
এখানে “সমুচিত জবাব” বলতে হঠকারী উসকানি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও কৌশলী অবস্থান বোঝায়। সীমান্তে সহিংসতা বা অমানবিক আচরণ বন্ধ করা, পানি চুক্তিতে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, বাণিজ্যে অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের শক্তি শুধু জনসংখ্যা বা ভূখণ্ডে নয়—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় ভূমিকা, শ্রমবাজার, সমুদ্রসম্পদ ও ভূ-কৌশলগত অবস্থান—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি আরও কার্যকর করা, বহুমুখী অংশীদারত্ব শক্তিশালী করা এবং যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মান ও স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।
তবে এটাও মনে রাখা জরুরি—দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়। সম্পর্কের টানাপোড়েন সমাধানের পথ হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল সংলাপ, আর জনপরিসরে সভ্যতা, সংযম ও সত্যনিষ্ঠ আলোচনা। আবেগ নয়, দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তই দেশকে এগিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ কারও প্রতিপক্ষ হতে চায় না—বাংলাদেশ চায় ন্যায্যতা। তাই ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের উত্তর হতে হবে সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষাকারী, আন্তর্জাতিক নীতিমালা–সম্মত, এবং জাতীয় স্বার্থে অটল। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা একটি জাতির অধিকার—আর সেই অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে হতে হবে আরও ঐক্যবদ্ধ, আরও দক্ষ, আরও সাহসী।
—সৌহার্দ্য বজায় থাকুক, কিন্তু বাংলাদেশের মর্যাদা যেন কখনো প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। বাংলাদেশকে “সম্মান–সমতা–স্বার্থ” এই তিন নীতিতেই প্রতিবেশী সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।