— Π আতাউর রহমান:
শিক্ষক সমাজের আলোকবর্তিকা। জ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে একজন শিক্ষকই পারেন একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে এবং জাতিকে উন্নয়নের সঠিক পথে এগিয়ে নিতে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর লক্ষ্য—শিক্ষক সমাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের অধিকার সুরক্ষা, এবং বিশ্বজুড়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে সচেতনতা সৃষ্টি।
এবারের প্রতিপাদ্য— “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষা: স্বয়ংক্রিয়তার যুগে মানবিক দক্ষতা সংরক্ষণ।” বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে রূপান্তরিত করছে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি সত্ত্বেও মানবিকতা, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার জায়গা কেবল একজন শিক্ষকই পূরণ করতে পারেন। ইউনেস্কোর সদর দপ্তর প্যারিসে এ দিবস পালনের পরিবর্তে এবার ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের সদর দপ্তরে আয়োজিত হচ্ছে, যা প্যান-আফ্রিকান কনফারেন্স অন টিচার এডুকেশন (PACTED)-এর অংশ। এর মাধ্যমে আফ্রিকার শিক্ষা কৌশল ও টেকসই উন্নয়নে শিক্ষকের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
✦ বাংলাদেশে শিক্ষকের অবস্থা
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষক কর্মরত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ১৬,৮০৫ জন। সংখ্যায় বিশাল হলেও মানের প্রশ্নে শিক্ষকতার অবস্থান শঙ্কাজনক। অধিক যোগ্যরা শিক্ষকতায় আগ্রহী হচ্ছেন না। বিশেষত বেসরকারি শিক্ষকেরা আর্থিক দিক থেকে বঞ্চিত ও সামাজিক মর্যাদায় অবমূল্যায়িত। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে মানসম্পন্ন শিক্ষক সংকট তীব্র হচ্ছে।
প্রশ্ন জাগে—যোগ্যরা শিক্ষকতায় আসছেন না কেন? সংক্ষেপে উত্তর হলো:
❖বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ও সুবিধা অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় কম।
❖ ক্ষমতা ও মর্যাদায় বৈষম্য বিদ্যমান।
❖ অনেক শিক্ষার্থী তাদের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিচ্ছে না।
❖ যোগ্যতা শিথিল ও বয়সসীমায় ছাড় দিয়ে মান বজায় রাখা যাচ্ছে না।
✦ চ্যালেঞ্জ ও সংকট
প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের অসামঞ্জস্য। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরে কাম্য অনুপাত ১:৩০ এবং মাধ্যমিকে ১:২০। অথচ বাস্তবে এটি অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে প্রাথমিক স্তরে অনুপাত ছিল ৩০:১, কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে কোথাও কোথাও তা ৪০–৪৫ জন শিক্ষার্থী প্রতি একজন শিক্ষক। ফলে মানসম্পন্ন পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো ম্যানেজিং কমিটি নামক কাঠামো। বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা অশিক্ষিত ব্যক্তিরা কমিটিতে প্রবেশ করে শিক্ষকদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। কখনো তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে শিক্ষককে ব্যবহার করতে চান, অবৈধ সুবিধা আদায়ে চাপ সৃষ্টি করেন। এতে শিক্ষকদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ব্যাহত হয় এবং শিক্ষকদের জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
✦ করণীয় ও প্রস্তাবনা
শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি—
❖ যোগ্য প্রার্থীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার মতো উপযুক্ত বেতন-ভাতা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করা।
❖ শিক্ষক নিয়োগে মানদণ্ড কঠোরভাবে বজায় রাখা এবং অবহেলা বা রাজনৈতিক প্রভাব পরিহার করা।
❖ সরকারি পর্যায়ে ম্যানেজিং কমিটির স্বেচ্ছাচারিতা রোধে নজরদারি বাড়ানো।
❖ শিক্ষকদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা সুযোগ ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
❖ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকদের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
✦ কেমন হওয়া উচিত শিক্ষক
একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীর বন্ধু ও পথপ্রদর্শক। তার পাঠদান প্রাণবন্ত, সৃজনশীল ও অনুপ্রেরণাদায়ী। তিনি নিজে সৎ, সময়ানুবর্তী ও নীতিনিষ্ঠ। শিক্ষার্থীদের নেশা, ইভটিজিং, যৌতুক, দুর্নীতি, সহিংসতা থেকে দূরে রাখতেও তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। অর্থাৎ, তিনি কেবল জ্ঞানের বাহক নন, জীবন গড়ার প্রেরণাদাতা।
জাতি গঠনের ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা, আর মানসম্মত শিক্ষার মূল চাবিকাঠি হলো মর্যাদাশীল শিক্ষক। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিক্ষকদের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, এবং যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করা।