আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে ব্যাহত রপ্তানি, বাড়ছে শিপিং খরচ

স্টাফ রিপোর্টার | দেশ এডিশন
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে। আকাশসীমা বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে অতিরিক্ত চার্জ আরোপের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষিপণ্য, তৈরি পোশাক ও হিমায়িত খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে সবজি, তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য। একই সময়ে ইরানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩৯ হাজার ডলারের পণ্য। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে একদিনেই প্রায় ৮০ টন সবজি রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি, এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা।

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের অন্যতম প্রধান বাজার। দেশের মোট সবজি রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ ওই অঞ্চলে যায়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য রপ্তানি করা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব রপ্তানি কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।

এদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচলে আরও বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিশেষ করে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান পরিস্থিতির কারণে দেশের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে। অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, কিন্তু পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, শিল্পকারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান তা পাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।

শিপিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে একটি ৪০ ফুট কনটেইনার ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার খরচ হচ্ছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই ব্যয় এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশের বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের নীতিগত পরিবর্তন ও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণেও রপ্তানিতে প্রভাব পড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা দ্রুত নিরসন না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বিকল্প পরিবহন সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো দ্রুত বাজার দখলের চেষ্টা করতে পারে।

তারা মনে করছেন, আকাশপথ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রপ্তানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

error: Content is protected !!