ইরানের দুঃসময়ে রাশিয়ার নীরবতা: ভূরাজনীতি চলে স্বার্থে, আবেগে নয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | দেশ এডিশন:
প্রকাশ: ৫১ minutes ago

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির সময়ে যখন ইরান ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে, ঠিক তখনই বহুদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়ার কৌশলগত নীরবতা প্রশ্ন তুলছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। যে ইরান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দিয়েছিল বলে পশ্চিমা বিশ্ব অভিযোগ করে আসছে, আজ সেই ইরানের সংকটে মস্কোর অবস্থান দৃশ্যত শীতল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল কূটনৈতিক দূরত্ব নয়—বরং স্বার্থকেন্দ্রিক ভূরাজনীতির নগ্ন বাস্তবতা।

ড্রোন সহযোগিতা, তারপর দূরত্ব
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই অভিযোগ ওঠে, ইরান রাশিয়াকে “শাহেদ” ড্রোন সরবরাহ করেছে। যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি যুদ্ধ সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই সহযোগিতা রাশিয়া-ইরান সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক চাপে রাশিয়া প্রকাশ্য শক্ত অবস্থান নেয়নি। বরং সীমিত বক্তব্য আর ‘সংযমের আহ্বান’–এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকেছে মস্কো।

ভূরাজনীতি চলে স্বার্থে, বন্ধুত্বে নয়
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের সম্পর্ক আবেগে নয়—স্বার্থে পরিচালিত হয়। ভূরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। রাশিয়া আজ সেই নীতিতেই হাঁটছে।

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং নিষেধাজ্ঞার চাপে রাশিয়ার অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ এখন আগের চেয়ে বেশি স্পর্শকাতর। ইরান যদি সরাসরি বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে রাশিয়া নিজস্ব রপ্তানি বাড়িয়ে বাজার দখলের সুযোগ দেখতে পারে।

তেল রাজনীতির নীরব হিসাব
বিশ্ব তেলবাজারে ইরান ও রাশিয়া—দুই দেশই বড় খেলোয়াড়। ইরানের রপ্তানি সীমিত হলে বা ঝুঁকিতে পড়লে, রাশিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি বাজার সুবিধা পেতে পারে। ফলে ইরানের বিপদের সময় সরাসরি জড়িয়ে পড়া মস্কোর অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, “জ্বালানি রাজনীতি অনেক সময় সামরিক বন্ধুত্বকেও ছাপিয়ে যায়।”

কূটনৈতিক নীরবতার বার্তা
রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু দৃশ্যমান সামরিক বা কড়া কূটনৈতিক পদক্ষেপের অভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে—মস্কো এখন হিসাব কষে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

ইরানের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে—
যে সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশ নিজেদের ‘কৌশলগত অংশীদার’ বলেছিল, তা কি কেবল প্রয়োজনের সময়ের সমীকরণ ছিল?

বাস্তবতা: বন্ধুত্ব নয়, স্বার্থই চূড়ান্ত

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধুত্ব নেই। আজকের মিত্র কালকের নীরব দর্শক হয়ে যেতে পারে। রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই বাস্তবতারই নতুন উদাহরণ।

বিশ্ব রাজনীতির কঠিন সমীকরণে একটাই সত্য স্পষ্ট—
ভূরাজনীতি চলে স্বার্থে, আবেগে নয়।

error: Content is protected !!