ইলিশের প্রজনন ব্যাহত, টেকসই উৎপাদন হুমকিতে: প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণেই কমছে ইলিশ সম্পদ

দেশ এডিশন প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

দেশ এডিশন প্রতিবেদন:

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ এখন টেকসই উৎপাদনের সংকটে। প্রজনন ও জীবনচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের ইলিশ সম্পদ। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে—গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ কমছে, ফলে মাছটির দামও পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, মূলত দুটি প্রধান কারণে ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে—প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ও মানবসৃষ্ট কারণ। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে অভিবাসন রুটে প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান দূষণ। অপরদিকে, মানবসৃষ্ট চাপের মধ্যে রয়েছে অবৈধ ট্রলিং, জাটকা ও মা ইলিশ ধরা এবং অবৈধ জালের ব্যবহার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারও ইলিশ আহরণ হ্রাসের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গত পাঁচ বছরে ইলিশ আহরণ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। চলতি বছরের জুনে জাটকা আহরণের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরও ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়েনি। বরং মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের তুলনায় জুলাইয়ে ইলিশ আহরণ কমেছে ৩৩.২০ শতাংশ এবং আগস্টে ৪৭.৩১ শতাংশ। এই দুই মাসে আহরণ হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৯৩ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ কম।

বিএফআরআইর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞার ফলে ৫২.৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছিল, যার ফলে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি জাটকা পরিবারে যুক্ত হয়েছে। তবুও পরিণত ইলিশের উৎপাদন বাড়েনি প্রত্যাশিত হারে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ডিম পাড়ার হার বেড়েছে ১১ শতাংশ, কিন্তু ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ—যা আশঙ্কাজনক বৈষম্য নির্দেশ করে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। প্রজননের জন্য এটি সমুদ্র থেকে নদীতে আসে এবং ডিম ছাড়ার পর জাটকা বড় হয়ে আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। কিন্তু বর্তমানে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, দৌলতখান ও চাঁদপুর অঞ্চলের নদীপথে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় মা ইলিশের প্রজনন যাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাঁদপুরের চর হাইচর, ভৈরবী ও ইব্রাহিমপুর, ভোলার জাহাজ মারা ও হামতিয়াচর, পটুয়াখালীর দাসনারচর ও চরকলমাখালি এবং চরফ্যাশন অঞ্চলে নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে ইলিশের অভিবাসন রুট ভেঙে পড়ছে।

এছাড়া, নদীর পানির মান দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। শীতকালে প্রথম অভয়াশ্রম এলাকায় অক্সিজেনের মাত্রা কমে এবং অ্যামোনিয়ার ঘনত্ব বেড়ে যায়, যা মাছের জন্য বিষাক্ত। শিল্প বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক ও নগরবর্জ্যের কারণে এই দূষণ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘনার নিম্নপ্রবাহে এই দূষণ ছড়িয়ে পড়ায় ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও অভিবাসনপথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদীকেন্দ্র, চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আমিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, “প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণে ইলিশের জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে, যা উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে অভিবাসন রুট সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ট্রলিং বন্ধ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।”

ইলিশের টেকসই উৎপাদন রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, বাংলাদেশের জাতীয় মাছটি হয়তো ভবিষ্যতে কেবল ইতিহাসের পাতাতেই বেঁচে থাকবে।

error: Content is protected !!