এক বছরে ‘আমার দেশ’: নির্বাসন, লড়াই ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পুনর্জন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না—এই বাস্তবতা সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে। জীবনের শুরুর দিনগুলো যেখানে ধীর, দীর্ঘ ও স্বপ্নে ভরা মনে হয়, শেষপ্রান্তে এসে সময় যেন হঠাৎ করেই দ্রুতগতির হয়ে ওঠে। জন্মদিন তখন আর কেবল আনন্দের উপলক্ষ থাকে না; বরং আত্মসমীক্ষার এক নীরব মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসিত জীবন শেষে ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক। সে সময় তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। হাসপাতাল থেকে বাসায় আনার পর শুরু হয় পত্রিকাটির পুনঃপ্রকাশের প্রস্তুতি। এর মধ্যেই ২০২৪ সালের ৬ জুলাই ভোরে তিনি মাকে হারান। ব্যক্তিগত শোক আর দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়েই ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর আমার দেশ-এর নবযাত্রা শুরু হয়। দেখতে দেখতে কেটে যায় আরেকটি বছর।

২০০৮ সালে আমার দেশ-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিডিয়ায় তাঁর যাত্রা শুরু। মরহুম আতাউস সামাদ, সৈয়দ আবদাল আহমদসহ কয়েকজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও তৎকালীন মালিকপক্ষের অনুপ্রেরণায় সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করেন তিনি। এর আগেই নয়া দিগন্তে কলাম লেখার মাধ্যমে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতি, বিচার বিভাগের দলীয়করণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আমার দেশ ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নেয়। এর ফল হিসেবে পত্রিকাটি একাধিকবার বন্ধের মুখে পড়ে। ২০১০ সালে সাময়িকভাবে এবং ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল স্থায়ীভাবে ছাপাখানা সিলগালা করা হয়। সে সময় একাধিক দফায় কারাবরণ করতে হয় সম্পাদককে। কারাগারেই লেখা হয় বহুল আলোচিত বই জেল থেকে জেলে এবং পরে ইংরেজি গ্রন্থ The Political History of Muslim Bengal।

২০১৮ সালে নির্বাসনে যাওয়ার পরও লেখালেখি থেমে থাকেনি। দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর আগের একই ফ্যাসিবাদ ও আগ্রাসনবিরোধী সম্পাদকীয় নীতি বজায় রেখে আমার দেশ পুনঃপ্রকাশিত হয়।

পুনঃপ্রকাশের পর থেকে পত্রিকাটি নিরপেক্ষতা ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছে। সম্পাদকীয় নীতিতে কোনো রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতি তোষামোদ না করার অবস্থান স্পষ্ট রাখা হয়েছে। করপোরেট স্বার্থ ও প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান পত্রিকার সম্পাদক।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন পক্ষ থেকে চাপ ও সমালোচনা থাকলেও, পাঠকদের ভালোবাসা ও সমর্থনই আমার দেশ-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। পুনঃপ্রকাশের এক বছরে পাঠকসংখ্যা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বেড়েছে।

এবারের যাত্রায় নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ও মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। সীমিত বাজেট ও অবকাঠামোর মধ্যেই ইউটিউব ও ফেসবুকে কনটেন্ট উৎপাদন শুরু করা হয়। প্রথম দিকের একটি ভিডিও থেকেই ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। বিশেষ করে পুনঃপ্রকাশের প্রথম দিনের লিড নিউজ ডিজিটাল মাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন দর্শক ছুঁয়েছে, যা পত্রিকার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

অনেক পাঠক ও দর্শক নিয়মিতভাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আমার দেশ-এর সংবাদ অনুসরণ করছেন বলে জানিয়েছেন। এতে একদিকে সন্তুষ্টি থাকলেও, ছাপা পত্রিকার প্রতি স্বাভাবিক আবেগও রয়ে গেছে বলে স্বীকার করেন সম্পাদক।

এক বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দিয়েছেন মহান আল্লাহ। পাঠকদের ভালোবাসাই সব ক্ষতি ও বাধা পুষিয়ে দিয়েছে। পুনঃপ্রকাশের বর্ষপূর্তিতে পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন—হয়তো এখন জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

error: Content is protected !!