বছরের শেষ প্রান্তে এসে আবারও পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুত আছে— বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি সম্পূর্ণ সিন্ডিকেটের কারসাজির ফল।
দেড় মাসেরও বেশি সময় পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল ছিল। বাজারে এতদিন প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই এই হঠাৎ দাম বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের দেশ এডিশনকে বলেন, “বৃহস্পতিবার থেকে কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। এখন ৭৭-৮০ টাকায় কিনে ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি করছি।” তবে তিনি মনে করেন, গত বছরের তুলনায় দাম এখনো অনেক কম। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ে পেঁয়াজের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি, যা এখন প্রায় ৪৬ শতাংশ কম।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, “এই মুহূর্তে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। নিশ্চিতভাবেই এটি বাজার কারসাজির ফল। এখনো কৃষকের হাতে প্রায় পাঁচ লাখ টন পেঁয়াজ মজুত আছে। ফলে আগামী দুই মাস কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই।”
তিনি আরও বলেন, নভেম্বরেই গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বাজারে আসবে এবং ডিসেম্বর মাসে মুড়িকাটা পেঁয়াজও উঠবে। ফলে দাম দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ চাহিদার চেয়েও বেশি। তবুও বিদেশ থেকে আমদানির অনুমতি (আইপি) চেয়ে জমা পড়েছে প্রায় তিন হাজার আবেদন। তবে সরকার এখনো অনুমতি দেয়নি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুর রহমান বলেন, “এখন আমদানির অনুমতি দিলে কৃষক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।”
কিছু আড়তদার দাবি করছেন, মজুতদাররাই বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। রাজধানীর শ্যামবাজারের এক আড়তদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যখনই ভারতে দাম কমে, তখন কিছু ব্যবসায়ী দেশে সংকটের গুজব ছড়িয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়, যাতে কম দামে আমদানি করে বেশি দামে বিক্রি করা যায়।”
সূত্র জানায়, ভারত থেকে ২০ রুপিতে কেনা পেঁয়াজ কাগজে ৩০ রুপি দেখিয়ে আনা হয়— এতে টাকা পাচার ও অবৈধ পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি হয়।
এদিকে, আইপি না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী হাইকোর্টে রিট করেন, যার মধ্যে আটটি ইতোমধ্যে খারিজ হয়ে গেছে। হিলি বন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বলেন, “অনেক ব্যবসায়ী এলসি খুলে পেঁয়াজ বন্দরে এনেছেন, কিন্তু অনুমতি না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন দেশ এডিশনকে বলেন, “দেশে ভালো উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কিছু আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও দাদন ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানির পাঁয়তারা করছে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে না আনলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ৩৫ লাখ টন, আর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভালো উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে দেশ এখন পেঁয়াজে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
– দেশ এডিশন নিউজ ডেস্ক