খাস জমিতে সেনা ক্যাম্প স্থাপনে বাধা দিচ্ছে ইউপিডিএফ

নিজস্ব প্রতিবেদক | দেশ এডিশন
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বার্মাছড়ি ইউনিয়নের আর্য কল্যাণ বনবিহার এলাকায় সেনাবাহিনী একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও বাধা দিচ্ছে ভারতের মদতপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। তারা দাবি করছে, জায়গাটি বনবিহারের নামে নিবন্ধিত ধর্মীয় সম্পত্তি। অথচ সরকারি নথি ও ১৯৩৪ সালের কলকাতা গেজেট স্পষ্ট বলছে—জমিটি রাষ্ট্রীয় খাস জমি, যা সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষিত।

সরকারি নথিতে খাস জমির প্রমাণ

১৯৩৪ সালের ১১ এপ্রিল প্রকাশিত কলকাতা গেজেটে উল্লেখ আছে, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার আওতাধীন ‘জঙ্গল খিরাম জেএল নম্বর ৭৩’-এর নির্দিষ্ট রিভিশনাল সার্ভে প্লট নম্বর ২০০/৩৭৪ সরকারি সংরক্ষিত বনভূমি। অর্থাৎ জমিটি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে কখনো বরাদ্দ হয়নি।

একজন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন,

“আমাদের হাতে গেজেটের কপি রয়েছে। এই জমি সরকারি খাস। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সেনাবাহিনী যেকোনো জায়গায় ক্যাম্প করতে পারে, এতে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।”

ইউপিডিএফের উসকানিতে উত্তেজনা

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউপিডিএফ সমর্থিত একটি অংশ সেনা ক্যাম্প স্থাপন ঠেকাতে নারী ও শিশুদের সামনে রেখে ‘মানব ঢাল’ তৈরি করছে। তারা দাবি করছে, এটি ধর্মীয় স্থানে অনধিকার প্রবেশের শামিল। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, খাস জমিতে ধর্মীয় দখল বেআইনি।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আফরোজ ভূঁইয়া বলেন,

“জমিটি নিয়ে বিরোধ রয়েছে, আমরা সরকারি নথি অনুযায়ী বিষয়টি যাচাই করছি। এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।”

২৯ অক্টোবর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নতুন শঙ্কা

বর্মাছড়ি আর্য কল্যাণ বনবিহারে আগামী ২৯ অক্টোবর “মহাসংঘদান” নামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রচারণায় বলা হচ্ছে, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় এবং পার্বত্যবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। তবে প্রশাসন জানিয়েছে, উপদেষ্টার এমন কোনো সরকারি সফরসূচি তাদের কাছে আসেনি।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বলেন,

“আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। অনুমোদনবিহীন কোনো আয়োজন থেকে যাতে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।”

সরকারের নীরবতায় প্রশ্ন

একজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা দেশ এডিশনকে বলেন,

“আমরা মাঠে টহল দিচ্ছি, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে ইউপিডিএফ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এই ধরনের উসকানি রোধ করা কঠিন।”

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেন,

“সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন নারী-শিশুদের সামনে রেখে সেনার অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করে, সেটা জনসমর্থনের অভাবেরই প্রমাণ। সরকার যদি দ্রুত নীতি না নেয়, পার্বত্যাঞ্চল অস্থিতিশীল হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন,

“বিশ্বে দেখা গেছে—যেখানে সামরিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, সেখানেই বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথা তোলে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান, কসোভো—সবই এর উদাহরণ।”

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার প্রতিটি মুহূর্তে ইউপিডিএফের মতো সংগঠনগুলো নিজেদের শক্ত করছে। সরকারের নীরবতা ও রাজনৈতিক অদক্ষতা চলতে থাকলে—রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা উভয়ই হুমকিতে পড়তে পারে।

error: Content is protected !!