গাংনী উপজেলায় সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে অন্তত ৪৫টি লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় এসব ইটভাটা দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমির মাটি কিনে ভ্যাকু মেশিনের মাধ্যমে কেটে ড্রাম ট্রাকে করে ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ফলদ ও বনজ গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি মাটি বহনকারী ভারী যান চলাচলের কারণে সড়কগুলো ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। এসব রাস্তা মেরামতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও ভোগান্তি কমছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লাইসেন্সবিহীন ইটভাটাগুলোতে দেদারছে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ভাটার চারপাশে মজুত করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার মন কাঠ। কাঠ পোড়ানোর ফলে চিমনি দিয়ে নির্গত ঘন ধোঁয়ায় আশপাশের বসতবাড়ি, ফসল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে। এলাকাবাসীর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চর্মরোগসহ নানা রোগ বাড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ধোঁয়ার প্রভাবে গাছপালাও শুকিয়ে যাচ্ছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তির (জিগজ্যাগ, হাইব্রিড হফম্যান, ভার্টিক্যাল শ্যাফট, টানেল কিলন ইত্যাদি) ইটভাটা স্থাপন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। তবে গাংনী উপজেলার কোনো ইটভাটারই এসব বৈধতা নেই বলে জানা গেছে। তা সত্ত্বেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় বীরদর্পে চলছে তাদের কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাংনী থানা রোড, হাড়িয়াদহ রোড, হিজলবাড়িয়া রোড, পোড়াপাড়া, বামন্দী, কাজিপুর রোড, মটমুড়া, আকুবপুর, বাওট, নওদাপাড়া, তেরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে।
অলিনগর গ্রামের পথচারী শরিফুল ইসলাম বলেন, “রাস্তায় হাঁটা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক চলাচলই কষ্টকর। ইটভাটার গাড়ির কারণে রাস্তায় পুরু মাটির স্তর জমে থাকে। সামান্য বৃষ্টিতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।”
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা বন কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, “ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে প্রশাসন অভিযান চালালে বন বিভাগ সহযোগিতা করবে।”
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জীব মৃধা জানান, “অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাটি উত্তোলনের ফলে কৃষিজমির উর্বরতা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।”
পরিবেশ অধিদপ্তর মেহেরপুরের সহকারী পরিচালক শেখ মেহেদি কামাল বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় আপাতত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে দ্রুত অভিযান চালানো হবে।”
এ বিষয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবীরের ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালিয়ে পরিবেশ, কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।