Π আতাউর রহমান:
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক গুরুত্বপূর্ণ বাক্য উচ্চারণ করেন—
“রাজনীতির ব্যাপারেও ঐকমত্য, নির্বাচনের ব্যাপারেও ঐকমত্য। আপনারা রাজনৈতিক নেতারা বসে সহজ করেন—কীভাবে নির্বাচন করবেন।”
এই উক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে সমঝোতা ও ঐক্যের আহ্বান মনে হলেও, এর ভেতরে নিহিত রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। সংবিধান নির্ধারিত নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের হাতে ‘নির্বাচন কীভাবে হবে’–এর সিদ্ধান্ত তুলে দেওয়ার আহ্বান আসলে একটি সাংবিধানিক প্রশ্নও বটে। এটি কেবল নির্বাচন-সংক্রান্ত বক্তব্য নয়, বরং রাষ্ট্রচিন্তার এক নতুন প্রস্তাবনা—যেখানে ‘আইন’ ও ‘আদর্শ’, ‘সংবিধান’ ও ‘সংলাপ’, ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সমঝোতা’—এই দ্বৈত ধারাগুলোর সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গণঅভ্যুত্থান থেকে ঐক্যরাজনীতি: নতুন বাস্তবতার জন্ম
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
এই আন্দোলন কেবল সরকারবিরোধী প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল এক গভীর সামাজিক অসন্তোষের বিস্ফোরণ—যেখানে তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষক, শ্রমিক, এবং সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামে।
এই গণজোয়ারই জন্ম দেয় জুলাই আন্দোলনের—যার পরিণতি হলো জুলাই জাতীয় সনদ, একটি ৮৪ দফার প্রস্তাবনাসহ সংবিধান পুনর্গঠনের পরিকল্পনা।
সনদটি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষণাপত্র নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পুনর্লিখনের এক উচ্চাভিলাষী দলিল।
এখানে সংবিধানের তিন ডজনেরও বেশি অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রয়েছে; বাতিলের কথা বলা হয়েছে ৭(ক), ৭(খ) ও ১৫০(২) অনুচ্ছেদের মতো সংবেদনশীল ধারা; এমনকি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির বর্ধিত ক্ষমতা, এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের পরিকল্পনাও যুক্ত হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—এটি কি গণঅভ্যুত্থানের আদর্শিক ধারাবাহিকতা, নাকি আন্দোলনের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আবদ্ধ করার একটি রাজনৈতিক রূপান্তর?
সংবিধান ও নির্বাচনের মধ্যকার দ্বৈরথ
ড. ইউনূসের আহ্বান—“রাজনৈতিক নেতারা বসে ঠিক করুন, কীভাবে নির্বাচন করবেন”—একটি সাংবিধানিক পরিসরে অসাধারণ কিন্তু বিতর্কিত প্রস্তাব।
কারণ বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই নির্বাচন কমিশন, ভোটার তালিকা, প্রার্থী মনোনয়ন, তদারকি ও নির্বাচন পরিচালনার পূর্ণ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে।
অর্থাৎ, নির্বাচন কোনো রাজনৈতিক আলাপের বিষয় নয়; এটি একটি সংবিধান-নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা।
তবুও, যদি রাজনৈতিক দলগুলো বসে “কীভাবে নির্বাচন করবেন” তা নতুন করে ঠিক করতে চায়, তবে তা মূলত সংবিধানকেই আলোচনার টেবিলে বসানো।
এখানে দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট—সংবিধান কি রাজনৈতিক সমঝোতার উপরে থাকবে, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতাই সংবিধানকে পুনর্লিখবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আজকের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
জুলাই সনদ: রাষ্ট্রচিন্তার নতুন রূপরেখা
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপরিচালনার মৌলিক নীতির মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে নতুন চারটি মূল্যবোধ—সমতা, মানব মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
এগুলো নিঃসন্দেহে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে কয়েকটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন, যেগুলো একদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে, আবার অন্যদিকে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রও তৈরি করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ—রাষ্ট্রপতিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণের স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া হলে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যত রাষ্ট্রপতির সদিচ্ছার উপর নির্ভর করবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন জনআস্থার প্রতীক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস বলছে—প্রত্যেক ‘অরাজনৈতিক’ শাসনব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ একদিকে নীতিগত ভারসাম্য আনতে পারে, তবে সেটি প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক স্থবিরতাও সৃষ্টি করতে পারে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ যথার্থই বলেছেন, “আমরা চাই না ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হোক; কিন্তু শুধু লিখলেই হবে না, বাস্তবায়নই আসল বিষয়।”
বর্জনের রাজনীতি ও ঐক্যের সীমা
জুলাই সনদে ২৫টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করলেও, অংশ নেয়নি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—যে দলটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাদের পাশাপাশি চারটি বাম দলও অনুপস্থিত ছিল।
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—“শুধু কিছু রাজনৈতিক দলের সই মানেই জাতীয় ঐক্য নয়; প্রকৃত ঐক্য আসে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে।”
এই অনুপস্থিতি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—
যদি ‘গণঅভ্যুত্থান’ ছিল জনগণের আন্দোলন, তবে ‘জুলাই সনদ’ কেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষণাপত্র হয়ে গেল?
এখানেই সনদটি একধরনের “বর্জনের রাজনীতি” তৈরি করেছে—যেখানে জনগণ, সামাজিক আন্দোলন, এবং পেশাজীবীরা প্রতীকমাত্রে উপস্থিত, কিন্তু সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নেই।
এভাবে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধীরে ধীরে স্থান দিচ্ছে দলীয় সমঝোতার রাজনীতিকে।
অর্থাৎ, জনতার বিপ্লবের শক্তি আবার ফিরে যাচ্ছে রাজনীতির টেবিলে—যেখানে জনগণের কণ্ঠস্বর প্রায়শই নিঃশব্দ হয়ে যায়।
সংবিধান পুনর্গঠন না পুনর্বিন্যাস?
জুলাই সনদ যে বিশাল পরিসরে পরিবর্তনের রূপরেখা দিয়েছে, তা এক অর্থে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংবিধান লেখার প্রস্তাবের সমান। রাষ্ট্রের ভাষা, নাগরিক পরিচয়, মৌলিক অধিকার, নির্বাচন ব্যবস্থা, এমনকি ক্ষমতার বিভাজন—সবকিছু নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, “বাঙালি জাতি” ও “বাংলাদেশি নাগরিক” বিভাজন তুলে দিয়ে সকলকে “বাংলাদেশি” হিসেবে চিহ্নিত করা, কিংবা রাষ্ট্রের অন্যান্য ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া—এগুলো সাংস্কৃতিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হলেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উস্কে দিতে পারে।
একইভাবে, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথক করা, বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদ নির্ধারণ—এগুলো গণতন্ত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর বাস্তব পদক্ষেপ হতে পারে, তবে একই সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্মাণের গভীর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সংবিধান সংশোধনে গণভোটের বাধ্যবাধকতা। এটি গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের নতুন মাত্রা আনতে পারে, কিন্তু অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে তা ব্যবহৃতও হতে পারে জনমত প্রভাবিত করার অস্ত্র হিসেবে।
অতএব, প্রশ্ন রয়ে যায়—এই পরিবর্তনগুলো কি সত্যিই রাষ্ট্রকে “আরও জবাবদিহিমূলক” করবে, নাকি নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করবে?
রাজনীতির নৈতিকতা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
ড. ইউনূসের বক্তব্যে যেমন মানবিক আহ্বান আছে, তেমনি আছে এক ধরনের হতাশাও—
“সব দেখে আমার লাভ কী হলো? কথা লিখলাম, কথা মানলাম না। কাজের মধ্যে গিয়ে মানলাম না।”
এই বাক্যটি কেবল উপদেষ্টার আক্ষেপ নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
আমরা নিয়ম লিখেছি, কিন্তু নিয়ম মানিনি; সংবিধান রচনা করেছি, কিন্তু তার প্রতি বিশ্বাস রাখিনি।
তাই জুলাই সনদের মূল সাফল্য নির্ভর করবে একটিমাত্র বিষয়ের উপর—রাজনৈতিক নৈতিকতা। যদি দলগুলো সংবিধান সংস্কারের আগে নিজেদের রাজনৈতিক চরিত্রে পরিবর্তন না আনে, তবে নতুন সংবিধানও পুরোনো সংস্কৃতির বন্দি হয়ে পড়বে।
কারণ সংবিধান কাগজে নয়, টিকে থাকে মানুষের মননে—যেখানে বিশ্বাসই হলো গণতন্ত্রের মূলে।
ইতিহাসের পুনরারম্ভ না পুনরাবৃত্তি
জুলাই সনদ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা বহন করে, কিন্তু একই সঙ্গে তার থেকে বিচ্যুতও। এটি নতুন সংবিধানের স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু তার বাস্তবায়নের পথ এখনো অস্পষ্ট।
যদি এই সনদ সত্যিকার অর্থে গণমানুষের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে, তবে তা হবে ইতিহাসের পুনরারম্ভ।
কিন্তু যদি এটি কেবল দলীয় ঐকমত্যের নতুন নাম হয়ে থাকে, তবে তা কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
অবশেষে, ড. ইউনূসের আহ্বান এক অর্থে সময়ের সীমানা অতিক্রম করেছে—
“ঐক্যের সুরেই আমরা নির্বাচনের দিকে যাব।”
এ সুর যেন কেবল সম্মেলন কক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং পৌঁছায় জনতার কণ্ঠে, মাটির ঘ্রাণে, আর সংবিধানের প্রাণে—যেখানে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক সেই জনগণই।