আরণ্যক শামছ:
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে যে আদিম মানুষটি প্রথম আগুন জ্বালানো শিখিয়েছিল, যে গুহামানব তার সঙ্গীকে শিখিয়েছিল পাথরের অস্ত্র দিয়ে শিকার করার কৌশল, তিনিই ছিলেন মানব ইতিহাসের প্রথম শিক্ষক। সেই অনাদিকাল থেকে শুরু করে আজকের এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও শিক্ষকের ভূমিকা অপরিবর্তিত, অনস্বীকার্য। শিক্ষক কেবল জ্ঞান বিতরণের যন্ত্র নন, তিনি মানুষ গড়ার কারিগর, সমাজ বিনির্মাণের রূপকার এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। তিনি শিক্ষার্থীর অন্তরে জ্বালিয়ে দেন জ্ঞানের প্রদীপ, ঘুচিয়ে দেন অজ্ঞতার অন্ধকার, দেখান সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের পথ। প্রতি বছর ৫-ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়, যা আমাদের সেইসব মহান কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়। এই দিবসকে সামনে রেখে শিক্ষকদের অবদান, তাদের সাথে শিক্ষার্থী, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, তাদের আদর্শ ও সংগ্রামের এক আলোচনামূলক ও বর্ণনামূলক বিশ্লেষণই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত শিক্ষকদেরই অবদানের ইতিহাস। প্রাচীন গ্রীসে সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিক শিক্ষকরা যে জ্ঞানচর্চার ধারা তৈরি করেছিলেন, তা আজও পশ্চিমা দর্শন, বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। সক্রেটিস কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়াই কেবল কথোপকথন ও প্রশ্নের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের যে স্পৃহা জাগিয়ে তুলেছিলেন, তা এক কথায় চিরকালের শ্রেষ্ঠ এপ্রোচ। তাঁরই ছাত্র প্লেটো প্রতিষ্ঠা করেন ‘একাডেমি’, যা ছিল ইউরোপের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্লেটোর ছাত্র অ্যারিস্টটল যুক্তিবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে রাজনীতির মতো বহু শাস্ত্রে যে মৌলিক অবদান রেখে গেছেন, তা কয়েক শতাব্দী ধরে পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে। এই গুরু-শিষ্য পরম্পরাই গ্রিক সভ্যতাকে জ্ঞানের শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল।
প্রাচীন ভারতেও আমরা দেখতে পাই তক্ষশীলা, নালন্দার মতো বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ, যেখানে চাণক্যের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং শিক্ষক তৈরি করেছেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতো সম্রাট। চাণক্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়, এটি একজন আদর্শ শিক্ষক কীভাবে তার ছাত্রকে দেশের যোগ্য শাসক হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তার এক প্রামাণ্য উদাহরণ। গুরু দ্রোণাচার্য, বিশ্বামিত্রের মতো পৌরাণিক চরিত্রগুলোও আমাদের সামনে শিক্ষকের কঠোরতা ও স্নেহের এক মিশ্র রূপ তুলে ধরে। গুরুগৃহে থেকে শিক্ষালাভের যে বৈদিক প্রথা, তা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক বিকাশের এক সামগ্রিক ব্যবস্থা ছিল।
মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বেও জ্ঞানচর্চায় শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে খালদুনের মতো পণ্ডিতরা ছিলেন একাধারে গবেষক ও শিক্ষক। তাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানভান্ডারই ইউরোপের রেনেসাঁর পথকে সুগম করেছিল। কর্ডোভার পাঠাগারগুলো যখন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত, ইউরোপ তখন অনেকটাই অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই সময়ে শিক্ষকরাই জ্ঞানের মশালকে প্রজ্বলিত রেখেছিলেন।
মধ্যযুগে, বিশেষ করে ইসলামের স্বর্ণযুগে, জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হয়। আব্বাসীয় খলিফাদের শাসনামলে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত ‘বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) ছিল একাধারে পাঠাগার, অনুবাদ কেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানী-গুণী ও শিক্ষকরা সমবেত হতেন এবং গ্রিক, পারসিক, ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করে এক বিশাল জ্ঞানভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন। আল-কিন্দি, আল-খাওয়ারিজমি, আল-রাজি, ইবনে সিনার মতো যুগান্তকারী বিজ্ঞানীরা ছিলেন এই জ্ঞানকেন্দ্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁরা একাধারে ছিলেন গবেষক, লেখক ও শিক্ষক। তাঁদের হাত ধরেই বীজগণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন ও জ্যোতির্বিজ্ঞান এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কর্ডোভা, কায়রো, দামেস্কের মতো শহরগুলো তখন ছিল জ্ঞানের আলোকবর্তিকা। এই সময়ে শিক্ষকরাই মূলত ইউরোপের রেনেসাঁর পথকে সুগম করেছিলেন, যখন ইউরোপের অনেকটাই ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষকরাই গ্রিক দর্শনকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে এবং নিজেদের মৌলিক অবদানে সমৃদ্ধ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করেছিলেন।
আধুনিক যুগে এসে শিক্ষকের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়েছে। শিল্পবিপ্লবের পর নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা তৈরি হয়েছে। রুশো, পেস্তালোৎসি, ফ্রোয়েবেলের মতো শিক্ষাচিন্তাবিদরা শিশুর মনস্তত্ত্ব বুঝে পাঠদানের নতুন নতুন পদ্ধতির সূচনা করেন। তাঁরা দেখান যে, ভয় দেখিয়ে বা কঠোর শাসনের মাধ্যমে নয়, বরং ভালোবাসা, খেলাধুলা ও শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহলকে গুরুত্ব দিয়েই প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শান্তিনিকেতনে এই ধারণাকেই মূর্ত করে তুলেছিলেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে, মুক্ত পরিবেশে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদানের যে মডেল তিনি তৈরি করেন, তা আজও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
মনীষী ও শিক্ষকদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ইতিহাসের পাতায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে একজন মহান শিক্ষকের স্পর্শে এক সাধারণ শিক্ষার্থী হয়ে উঠেছেন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। এই সম্পর্কগুলো কেবল জ্ঞান আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল আদর্শ, মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শনের এক গভীর মেলবন্ধন।
ম্যাসিডোনিয়ার রাজকুমার আলেকজান্ডারকে শিক্ষাদানের ভার পড়েছিল সে যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী অ্যারিস্টটলের ওপর। অ্যারিস্টটল কেবল তাঁকে যুদ্ধবিদ্যা বা রাষ্ট্রনীতিই শেখাননি, শিখিয়েছিলেন দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং বিশ্বের বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান। এই শিক্ষার প্রভাবেই আলেকজান্ডার কেবল একজন বিশ্বজয়ী যোদ্ধা হননি, তিনি যেখানেই গিয়েছেন, সেখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বিজয়ের সাথে সাথে গ্রিক জ্ঞান-বিজ্ঞানও বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। অ্যারিস্টটলের শিক্ষা না পেলে হয়তো আলেকজান্ডার একজন সাধারণ স্বৈরাচারী শাসক হতেন, ‘দ্য গ্রেট’ উপাধি পেতেন না। এই ঘটনা প্রমাণ করে, একজন সঠিক শিক্ষক একজন শাসককে কীভাবে প্রজাহিতৈষী ও জ্ঞানী করে তুলতে পারেন।
পারস্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি কবি ও দার্শনিক জালালউদ্দিন রুমি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানিত আলেম ও শিক্ষক। কিন্তু তাঁর জীবনে আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে তাঁর গুরু, রহস্যময় দরবেশ শামস তাবরিজির সংস্পর্শে এসে। শামসের সাহচর্য রুমিকে প্রথাগত জ্ঞানচর্চার জগৎ থেকে বের করে এনে ঐশ্বরিক প্রেমের এক গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত করে। তাঁদের সম্পর্ক ছিল তীব্র, বিতর্কিত এবং রূপান্তরকারী। শামসই রুমিকে শিখিয়েছিলেন যে, জ্ঞান পুঁথিতে নয়, বরং হৃদয়ের উপলব্ধিতে। এই গুরুর প্রভাবেই রুমির ভেতর থেকে উৎসারিত হয়েছিল ‘মসনভি’-র মতো কালজয়ী আধ্যাত্মিক কাব্য, যা আজও মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়। এই গুরু-শিষ্য সম্পর্ক প্রমাণ করে, একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলে তাঁকে এক নতুন সত্তা দান করতে পারেন।
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও সুফি ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ বা ‘ইসলামের রক্ষক’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর জ্ঞান অর্জনের পেছনে বহু শিক্ষকের অবদান ছিল। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল তাঁর আধ্যাত্মিক সংকট এবং সত্যের সন্ধান। তিনি তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যেমন ইমাম আল-জুয়াইনির কাছে শিক্ষালাভ করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান তাঁর ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে আত্মানুসন্ধান ও সাধনার মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ করেন, তা তাঁকে এক নতুন মানুষে পরিণত করে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দীন’ (ধর্মীয় বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবন) লেখার মাধ্যমে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যিনি কোটি কোটি মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকতার পথ দেখিয়েছেন।
নরেন্দ্রনাথ দত্ত নামক এক যুক্তিবাদী, জিজ্ঞাসু তরুণ কীভাবে বিশ্বজয়ী আধ্যাত্মিক নেতা স্বামী বিবেকানন্দে রূপান্তরিত হলেন, তার পেছনের কারিগর ছিলেন তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংস। রামকৃষ্ণ কোনো প্রথাগত পণ্ডিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর ছিল আধ্যাত্মিকতার গভীর উপলব্ধি। তিনি নরেনের সমস্ত সংশয়, সমস্ত প্রশ্নকে উড়িয়ে না দিয়ে, বরং তাঁর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি নরেনের অন্তর্নিহিত শক্তিকে চিনেছিলেন এবং বলেছিলেন, “নরেন একদিন জগৎ মাতাবে।” গুরুর এই বিশ্বাস এবং দেখানো পথই বিবেকানন্দকে শিকাগো ধর্মসভায় হিন্দুধর্মের মহত্ত্ব তুলে ধরতে এবং পরবর্তীতে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবার’ আদর্শ প্রচার করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই সম্পর্ক গুরু-শিষ্যের আধ্যাত্মিক আদান-প্রদানের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
নন্দবংশের অত্যাচারে যখন মগধের মানুষ অতিষ্ঠ, তখন সাধারণ এক ব্রাহ্মণ শিক্ষক চাণক্য এক অসামান্য প্রতিজ্ঞা করেন—তিনি এই স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাবেন। তিনি খুঁজে বের করেন সাধারণ এক বালক চন্দ্রগুপ্তকে এবং নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তাঁকে গড়ে তোলেন এক মহাবীর ও যোগ্য শাসক হিসেবে। চাণক্যের দেখানো পথেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ভারতের প্রথম অখণ্ড সাম্রাজ্য। এই ঘটনা আমাদের দেখায়, একজন দূরদর্শী শিক্ষক কেবল ব্যক্তি নয়, তিনি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন।
হেলেন কেলার ও অ্যান সুলিভানের কাহিনী থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই? জন্ম থেকেই অন্ধ ও বধির হেলেন কেলারের জীবন ছিল এক অন্ধকার কারাগারে বন্দীর মতো। তাঁর পৃথিবী ছিল শব্দহীন, আলোহীন। সেই জীবনে জ্ঞানের আলো নিয়ে আসেন তাঁর শিক্ষক অ্যান সুলিভান। অ্যানের অসীম ধৈর্য, ভালোবাসা এবং উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পদ্ধতির ফলেই হেলেন প্রথম ভাষার জগৎকে অনুভব করতে শেখেন। অ্যান একটি পাম্পের নিচে হেলেনের এক হাতে জলের ধারা ঢেলে অন্য হাতে যখন ‘w-a-t-e-r’ শব্দটি লেখেন, সেই মুহূর্তটি ছিল হেলেনের জীবনের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন, বহু বই লেখেন এবং বিশ্বজুড়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন। অ্যান সুলিভান প্রমাণ করেছেন, একজন শিক্ষক চাইলে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে এক অন্ধকার জীবনকেও আলোয় ভরিয়ে দিতে পারেন।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সমাজ ও রাষ্ট্রের ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। শিক্ষাব্যবস্থা একটি ত্রিভুজের মতো, যার তিনটি বাহু হলো—শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সমাজ ও রাষ্ট্র। এই তিনের মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক ছাড়া একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হলো একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। এই সম্পর্ক হওয়া উচিত শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং স্নেহের। একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীর বন্ধু, দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক (friend, philosopher, and guide) হয়ে ওঠেন। তিনি শিক্ষার্থীর শক্তি এবং দুর্বলতা দুটোকেই চেনেন এবং সেই অনুযায়ী তাকে বিকশিত হতে সাহায্য করেন। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরও উচিত শিক্ষকের প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই জ্ঞানার্জনের পথকে মসৃণ করে। বর্তমানে বাণিজ্যিক মনোভাব, অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার এই সুন্দর সম্পর্ককে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সমাজই শিক্ষকের কর্মক্ষেত্র। একজন শিক্ষক সমাজের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। সমাজ আশা করে, শিক্ষক তাদের সন্তানদের কেবল শিক্ষিত নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবেন। অন্যদিকে, শিক্ষকেরও সমাজের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। সমাজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধকে সম্মান করা এবং সেগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করা তাঁর অন্যতম কর্তব্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রেই সমাজ শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয় না। একজন ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় একজন রোগীর মৃত্যু হয়, একজন প্রকৌশলীর ভুলে একটি সেতু ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষকের ভুলের কারণে একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সমাজের এই গভীর সত্যটি অনুধাবন করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক এবং পৃষ্ঠপোষক। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরি করা, তাদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা এবং তাদের পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যখন রাষ্ট্র শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দেয়, তখন মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মানকে উন্নত করে। কিন্তু যখন শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন, রাজনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক জটিলতার শিকার হতে হয়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ হলো ভবিষ্যতের জন্য শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।
একজন শিক্ষকের আদর্শ কী হওয়া উচিত? তিনি হবেন জ্ঞানের প্রতি অনুরাগী, সত্যের পূজারী, উদার এবং নৈতিকতায় বলীয়ান। তিনি হবেন নিরপেক্ষ, সমস্ত শিক্ষার্থীর প্রতি সমান স্নেহশীল এবং তাদের সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাসী। তাঁর জীবনাচরণই হবে শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে বড় পাঠ্যপুস্তক। কিন্তু এই মহান আদর্শের বিপরীতে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা। বিশ্বজুড়েই শিক্ষকরা নানা ধরনের অবহেলা, অবিচার এবং বঞ্চনার শিকার। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট। অপ্রতুল বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত কাজের চাপ, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, আধুনিক শিক্ষা উপকরণের অভাব—এইসব প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেই তাদের কাজ করে যেতে হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে তাদের সত্তাকে বিসর্জন দিতে হয়। এই অবহেলা শিক্ষকদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়, যা তাদের পাঠদানকেও প্রভাবিত করে।
এই সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের সংগ্রামও চলছে প্রতিনিয়ত। নিজেদের অধিকার এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য তারা আন্দোলন করছেন, নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা করছেন। সমাজের উচিত এই সংগ্রামে তাদের পাশে থাকা, কারণ শিক্ষকদের সম্মান এবং অধিকার নিশ্চিত করা গেলে আদতে লাভবান হবে সমাজ এবং রাষ্ট্র। শিক্ষকদের পেশা একটি ইউনিভার্সেল পেশা। তাই, শিক্ষকদের অবদান কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি সমাজে শিক্ষকরা নীরবে বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে পরিচিত। এর মূল কারণ হলো, সেখানে শিক্ষকদের অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখা হয়। সেরা স্নাতকদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমর্থন দেওয়া হয়। এর ফলস্বরূপ, ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা লাভ করছে।
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই বারবার বলেছেন, “এক জন শিশু, এক জন শিক্ষক, একটি বই এবং একটি কলম পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।” নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর এই লড়াই আসলে বিশ্বজুড়ে শিক্ষকদেরই সম্মানকে তুলে ধরে। আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রামে যে শিক্ষকটি একটি গাছের নিচে বসে শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দিচ্ছেন, কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় যে শিক্ষিকা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি অস্থায়ী স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন—তাঁদের অবদান কোনো অংশে কম নয়। তাঁরাই প্রতিকূলতার মাঝেও জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত এই মহান পেশাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া। শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি, পুরস্কার এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। কারণ একজন সম্মানিত এবং সুখী শিক্ষকই পারেন একদল সুখী এবং আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থী তৈরি করতে।
সাহিত্য সমাজের দর্পণ। তাই বিশ্ব সাহিত্যেও শিক্ষকদের চরিত্র নানা রূপে, নানা মাত্রায় চিত্রিত হয়েছে। এই চরিত্রগুলো কখনও অনুপ্রেরণার উৎস, কখনও বা ব্যবস্থার শিকার এক অসহায় ব্যক্তিত্ব।
ইংরেজি সাহিত্যে ‘Goodbye, Mr. Chips’ উপন্যাসের মিস্টার চিপিং বা ‘Dead Poets Society’ সিনেমার জন কিটিং চরিত্রটি আদর্শ শিক্ষকের প্রতিমূর্তি। মিস্টার চিপস তাঁর কয়েক প্রজন্মের ছাত্রদের কাছে কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর স্নেহ, প্রজ্ঞা এবং রসবোধ দিয়ে তিনি ছাত্রদের মন জয় করেছিলেন। অন্যদিকে, জন কিটিং তাঁর ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে পৃথিবীকে নিজেদের চোখে দেখতে, কবিতার মাধ্যমে জীবনকে অনুভব করতে। ‘Carpe Diem’ (Seize the day) – তাঁর এই মন্ত্র ছাত্রদের শিখিয়েছিল গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে স্বপ্ন দেখতে।
অন্যদিকে, চার্লস ডিকেন্সের ‘Nicholas Nickleby’ উপন্যাসের ওয়াকফোর্ড স্কুয়ার্স চরিত্রটি এক অত্যাচারী এবং অর্থলোভী শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি, যিনি ছাত্রদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাতেন। এই চরিত্রটি তৎকালীন ইংল্যান্ডের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার এক তীব্র সমালোচনা। একইভাবে, ‘Harry Potter’ সিরিজের প্রফেসর স্নেইপ চরিত্রটি অত্যন্ত জটিল। তিনি হ্যারির প্রতি কঠোর এবং বিদ্বেষী হলেও, তাঁর অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ভালোবাসা এবং ত্যাগের মানসিকতা।
বাংলা সাহিত্যেও আমরা বিভিন্ন শিক্ষকের চরিত্র পাই। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পণ্ডিতমশাই’ উপন্যাসের বৃন্দাবন পণ্ডিত দারিদ্র্য এবং সামাজিক অবিচারের শিকার এক অসহায় শিক্ষক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের হোসেন মিয়াঁর স্কুলের শিক্ষক চরিত্রটিও গ্রামীণ সমাজে একজন শিক্ষকের অসহায়ত্ব এবং সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে। এই চরিত্রগুলো আমাদের দেখায় যে, একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত আদর্শ বা ইচ্ছা অনেক সময়ই পারিপার্শ্বিকতার কাছে পরাজিত হয়।
এই চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সাহিত্যিকরা শিক্ষক চরিত্রটিকে ব্যবহার করেছেন সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করার একটি মাধ্যম হিসেবে। তাঁরা দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষক যেমন পারেন একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলতে, তেমনই একটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা পারে একজন আদর্শ শিক্ষককেও নিষ্ক্রিয় বা অত্যাচারী করে তুলতে।
বিশ্বের মহান ব্যক্তিরা সবসময়ই শিক্ষকদের সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিয়েছেন। তাঁদের উক্তি ও গল্পগুলো শিক্ষকদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অ্যারিস্টটল বলেছেন, “যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী, তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়। পিতামাতা আমাদের জীবন দেন, আর শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।” এই উক্তিটি শিক্ষকের ভূমিকাকে পিতামাতার সমতুল্য বা তার থেকেও ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে।
আলবার্ট আইনস্টাইন বলতেন, “It is the supreme art of the teacher to awaken joy in creative expression and knowledge.” অর্থাৎ, ” সৃজনশীল প্রকাশ এবং জ্ঞানে আনন্দ জাগিয়ে তোলাই শিক্ষকের সর্বোচ্চ শিল্প”। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল তথ্য প্রদান নয়, বরং শিক্ষার্থীর ভেতরের কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলা।
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম ছিলেন একাধারে একজন বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক। তিনি বলতেন, “Teaching is a very noble profession that shapes the character, caliber, and future of an individual. If the people remember me as a good teacher, that will be the biggest honour for me.” তাঁর এই কথাগুলো প্রমাণ করে, তিনি দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েও শিক্ষক পরিচয়কেই সবচেয়ে বড় সম্মান বলে মনে করতেন।
একটি প্রচলিত গল্প আছে যে, একবার সম্রাট আলেকজান্ডারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি তাঁর পিতা ফিলিপকে বেশি সম্মান করেন, নাকি তাঁর গুরু অ্যারিস্টটলকে? আলেকজান্ডার উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি পিতার কাছে ঋণী আমার জীবনের জন্য, আর গুরুর কাছে ঋণী আমার ভালোভাবে জীবনযাপন শিখিয়ে দেয়ার জন্য।” এই একটি বাক্যই শিক্ষকের গুরুত্বকে মহাকালের প্রেক্ষাপটে মহান করে দেয়।
পরিশেষে বলব, শিক্ষক একটি প্রদীপের মতো, যিনি নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেন। তাঁর জ্ঞান, তাঁর ত্যাগ, তাঁর আদর্শ একটি সভ্যতার ভিত্তি তৈরি করে। ৫ই অক্টোবরের এই শিক্ষক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার একটি দিন হোক। আমরা যেন শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান, ভালোবাসা এবং মর্যাদা দিতে শিখি। রাষ্ট্র যেন তাদের সুরক্ষার এবং স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্ব নেয়। সমাজ যেন তাদের অবদানের কথা বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।
একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো একজন ভালো শিক্ষকের সান্নিধ্য। সেই শিক্ষকের দেখানো পথেই সে খুঁজে পায় নিজের ভবিষ্যৎ। তাই পৃথিবীর সকল শিক্ষকের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা। তাঁদের দেখানো আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবন, সুন্দর হোক আমাদের আগামী পৃথিবী। কারণ একজন আলোকিত শিক্ষকই পারেন একটি আলোকিত প্রজন্ম তৈরি করতে, আর একটি আলোকিত প্রজন্মই পারে একটি আলোকিত বিশ্ব গড়তে। যুগ যুগ ধরে তাঁরাই তো সভ্যতার আসল স্থপতি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অনুপ্রেরণার চিরন্তন বাতিঘর।
লেখক : একজন শিক্ষক, কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, পরিবেশবাদী লেখক।