তিস্তার স্রোত থামতেই থেমে গেল হাজারো স্বপ্ন

স্টাফ রিপোর্টার | দেশ এডিশন:
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ-এর উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারী এখন ভয়াবহ নদী সংকটের মুখে। একসময় প্রবহমান ও জীবন্ত থাকা জেলার অধিকাংশ নদী আজ পানিশূন্য হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, কৃষি ও মানুষের জীবিকায়।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা, বুড়িতিস্তা, চাড়ালকাটা, পাঙ্গা-খেড়ুয়া, যমুনেশ্বরীসহ ছোট-বড় প্রায় ৪০টি নদী নীলফামারীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মোট প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব নদীর অধিকাংশই বর্তমানে নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। অনেক নদী এখন শুধুই মানচিত্রে সীমাবদ্ধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক নদী তিস্তা নদী-এর উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ এবং একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে এ অঞ্চলের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমে গেছে। ফলে নদীগুলোতে পলি জমে দ্রুত ভরাট হয়ে পড়ছে এবং অনেক নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে।

একসময় এসব নদীতে পালতোলা নৌকা চলাচল করলেও এখন সেখানে দেখা যায় শুকনো চর। নদীর বুক জেগে ওঠা এসব চরে কৃষকরা বোরো ধান, ভুট্টা, তামাক, রসুন ও পিঁয়াজের আবাদ করছেন। তবে এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আরও ব্যাহত হচ্ছে। নদীর পানিশূন্যতার কারণে মাছের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে জেলে পরিবারগুলো কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, শুধু তিস্তা নদী ঘিরেই ৫০ হাজারের বেশি মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকার সংকটে রয়েছে।

অন্যদিকে, নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতেই পানি উপচে পড়ে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে ফসল নষ্ট হওয়া ছাড়াও ঘরবাড়ি তলিয়ে গিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
কৃষিবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় খাল-বিল ও জলাভূমিও বিলুপ্ত হচ্ছে, যার ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীগুলোর পুনঃখননের পরিকল্পনা নিলেও এখনো তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত পুনঃখনন এবং উজানের পানির ন্যায্য প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে নদীগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাব চৌধুরী বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা এবং ফসলি জমিতে রূপান্তরের ফলে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, যা বর্ষায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি নদী রক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নদীর মৃত্যু শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়—এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

error: Content is protected !!