ধানের শীষে কোন্দল, সুসংগঠিত জামায়াত ও নতুনদের চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২ মাস আগে

দিনাজপুর দীর্ঘ দেড় দশক পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে দিনাজপুরের সীমান্তঘেঁষা জনপদে এখন উৎসবের আমেজ। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ কাজ করলেও রাজনৈতিক সমীকরণে দেখা দিয়েছে নতুন মোড়। জেলার ছয়টি আসনের নির্বাচনী চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি বড় দল হিসেবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত। অন্যদিকে, সুশৃঙ্খল প্রচারণায় অনেকটা এগিয়ে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট দিনাজপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতেই বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দিনাজপুর-১, ২, ৪ এবং ৫ আসনে বর্তমান প্রার্থীর পরিবর্তন চেয়ে বঞ্চিত নেতাদের অনুসারীরা কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করছেন। অনেক জায়গায় মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা ধানের শীষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে খালেদা জিয়াকে প্রার্থী করায় সেখানে নেতাকর্মীরা চাঙ্গা ও ঐক্যবদ্ধ। এছাড়া দিনাজপুর-৬ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী ডা. জাহিদ হোসেনকে ঘিরে আশাবাদী স্থানীয় বিএনপি।

মাঠে সক্রিয় জামায়াত ও অন্যান্য দল বিগত নির্বাচনগুলোতে জোটবদ্ধ থাকলেও এবার দিনাজপুরের প্রতিটি আসনেই এককভাবে শক্তিশালী প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে দিনাজপুর-১, ৪ এবং ৬ আসনে দলটির সাবেক এমপি ও জনপ্রতিনিধিরা প্রার্থী হওয়ায় তারা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। ভোটারদের মধ্যেও “নতুন মুখ” দেখার এক ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং গণঅধিকার পরিষদও তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পর দিনাজপুরে একটি বহুত্ববাদী নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

আসনভিত্তিক সংক্ষিপ্ত চিত্র:

দিনাজপুর-১: বিএনপির মনজুরুল ইসলামের বিপরীতে জামায়াতের মতিউর রহমানের শক্ত অবস্থান। এখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে।

দিনাজপুর-২: বিএনপির সাদিক রিয়াজ পিনাকের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চলছে। মাঠে আছেন জামায়াতের মাওলানা আফজালুল আনাম।

দিনাজপুর-৩: খালেদা জিয়ার পৈতৃক নিবাস হওয়ায় এখানে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের মাঈনুল আলম।

দিনাজপুর-৪: সাবেক এমপি আক্তারুজ্জামান মিয়া মনোনয়ন পেলেও স্থানীয় বিএনপির একাংশের চরম বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।

দিনাজপুর-৫: আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস। বিএনপির কামরুজ্জামানের পাশাপাশি জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীরা সক্রিয়।

দিনাজপুর-৬: বিএনপির ডা. জাহিদ হোসেন এবং জামায়াতের আনোয়ারুল ইসলামের মধ্যে মূল লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন সাধারণ ভোটাররা।

ভোটারদের প্রত্যাশা সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সদর ও বিরল উপজেলার বেশ কয়েকজন ভোটার জানান, তারা বিগত কয়েক বছর ভোট দিতে পারেননি। এবার সুষ্ঠু ভোট হলে তারা এমন কাউকে বেছে নিতে চান যারা এলাকার উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন। অনেকের মুখেই শোনা যাচ্ছে— “আগে সবাইকে দেখেছি, এবার নতুন কাউকে সুযোগ দিতে চাই।”

ফ্যাসিবাদ মুক্ত পরিবেশে দিনাজপুরের এই নির্বাচনী লড়াই শেষ পর্যন্ত কার মুখে হাসি ফোটায়, তা দেখতে এখন দেশবাসীর নজর উত্তরের এই জনপদে।

error: Content is protected !!