ধু-ধু বালুচর তিস্তা, থমকে গেছে কৃষক-জেলে-মাঝিদের জীবন

দেশ এডিশন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে


খরস্রোতা তিস্তা আজ শুষ্ক মৌসুমে মরা খালে পরিণত। ধু-ধু বালুচরের মতো শুকিয়ে যাওয়া এ নদী ঘিরে উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে থমথমে সংকট। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং উজানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাবে তিস্তায় পানি না থাকায় কৃষি, মৎস্য ও নৌপথসহ সার্বিক পরিবেশ ভেঙে পড়েছে একাধিক জেলায়।

সরেজমিন দেখা যায়, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার প্রায় ১২৫ কিলোমিটার জুড়ে তিস্তায় এখন হাঁটুপানিও নেই। নদীর বুকে অসংখ্য চর জেগে ওঠায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। জেলেরা দিনের পর দিন অলস বসে থাকেন, মাঝিরা নৌকা বাইতে পারছেন না—ফলে বন্ধ হয়ে গেছে হাজারো মানুষের উপার্জনের পথ।

স্থানীয়রা জানান, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের কারণে মূল প্রবাহ আটকে থাকায় শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকেই তিস্তায় নাব্য সংকট তীব্র হয়। নভেম্বরের শুরুতেই নদীজুড়ে দেখা দেয় মরুভূমির মতো চিত্র। উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পলি জমে যেন নদীর মৃত্যু ঘটেছে।

তিস্তা নদী তীরের বাসিন্দা শহিদার রহমান বলেন, “ভারত নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে আমাদের দিকে পানি ছাড়ে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দিয়ে বন্যা সৃষ্টি করে, আবার শুষ্ক মৌসুমে ফোঁটাও দেয় না। আমরা বছরের পর বছর তিস্তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, সামান্য যে পানি রয়েছে তাও কয়েকটি খণ্ড খণ্ড চ্যানেলে প্রবাহিত হওয়ায় তা কোনো কাজে লাগছে না। নদী খনন ও সঠিক চ্যানেল তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তিস্তায় পানিহীনতার কারণে প্রায় ২০ রুটে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় চার হাজার নৌশ্রমিক ও জেলে। কৃষকরাও ফসল উৎপাদনে হিমসিম খাচ্ছেন, কারণ সেচের পানি নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীপারের দুই কোটির বেশি মানুষের জীবন এখন ভয়াবহ ঝুঁকিতে।

২০১১ সালে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত করা হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর থেকেই বাংলাদেশ তিস্তা মহাপরিকল্পনার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং চীনের সহযোগিতায় প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়। তবে ভারতের আপত্তিতে প্রকল্পটি এগোতে পারেনি।

‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন’-এর প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “তিস্তা নদীর মৃত্যু মানে উত্তরাঞ্চলের মৃত্যু। তিস্তা চুক্তি এখনই সই করতে হবে। আর দেরি হলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হবে।”

বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, “ভারত উজানে পানি আটকে রাখছে। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত পানি বর্ষায় ছেড়ে দেয়। এতে আমরা বন্যা পাই, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছাড়া উত্তরের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও পরিবেশ আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে। অন্যথায় উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে পড়বে।

দেশ এডিশন
— দেশের মাটি ও মানুষের সত্য খবর তুলে ধরে আপনার পাশে।

error: Content is protected !!