পদ্মা নদী-এর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চল যেন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। শিবচর উপজেলা-র বিচ্ছিন্ন এসব চরে বসবাসকারী মানুষ প্রতিদিন লড়াই করছেন নদীভাঙন, দারিদ্র্য, অবকাঠামোর অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চরনবীন ইউনিয়ন, দক্ষিণ চরপাড়া ইউনিয়ন এবং নতুন মাদার চর এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রতিটি দিন শুরু হয় সংগ্রামের গল্প নিয়ে, আর শেষ হয় টিকে থাকার ক্লান্ত নিঃশ্বাসে।
চরাঞ্চলে নেই পাকা রাস্তা, নেই বিদ্যুৎ সুবিধা, বিশুদ্ধ পানির সংকট চরমে। নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি, বসতঘর ও ফসলি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেকেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন—কবে আবার নদীর বুকে জেগে উঠবে নতুন চর, কবে গড়ে উঠবে নতুন বসতি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি ও মৎস্যই এখানে জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। বন্যা, খরা কিংবা আকস্মিক নদীভাঙনে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন তারা। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রায় নেই।
চরাঞ্চলে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। বর্ষা মৌসুমে প্রবল স্রোত আর নৌকার সংকটে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। প্রতিবছর নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটে, ফলে প্রাণহানির শঙ্কা লেগেই থাকে।
দক্ষিণ চরপাড়া ইউনিয়নের এক বাসিন্দা রাশেদ আলী বলেন, “যোগাযোগব্যবস্থা সবচেয়ে বড় সমস্যা। জরুরি সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে, চিকিৎসার অভাবে সাধারণ রোগও গুরুতর হয়ে যায়।”
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, “আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। রাস্তা নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই—এভাবেই জীবন কাটছে।”
চরনবীন ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান (৫৫) জানান, একসময় তার ফসলি জমি থাকলেও এখন সব নদীগর্ভে বিলীন। তিনি বলেন, “আমরা যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে বাস করি। এখানে বেঁচে থাকাই এক ধরনের সংগ্রাম।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই শতাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভূমিহীন হয়েছে। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও পশুপালনই তাদের প্রধান জীবিকা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও নাজুক। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেক শিশু প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না। স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ রোগও অনেক সময় মারাত্মক হয়ে ওঠে।
এক কলেজছাত্রী সাবিহা আক্তার বলেন, “চর থেকে শিবচর সদরে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস করা খুব কঠিন। সুযোগ থাকলে এখানে থাকতাম না।”
দক্ষিণ চরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন বেপারি বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, পদ্মার চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। অন্যথায়, এই অঞ্চলের মানুষের দুর্দশা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।