আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু হতেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত তিন দিনে অন্তত ৫২টি সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে, যাতে রক্তাক্ত হয়েছেন তিন শতাধিক নেতাকর্মী। একই সঙ্গে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সারা দেশে অন্তত ৪৫ জন প্রার্থী ও সমর্থককে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশন–এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কমিশনের নমনীয় অবস্থানের সুযোগে প্রার্থীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।
প্রচার শুরুর আগেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তফসিল ঘোষণার পর ওই সময়েই শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ে ইসিতে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নামমাত্র জরিমানা ও শোকজ নোটিসে সীমাবদ্ধ ছিল কমিশনের ব্যবস্থা। ফলে প্রচার শুরু হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন,
“আমরা কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে আছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও ফেমার সভাপতি মুনিরা খান বলেন,
“কমিশনের হাতে আইনগতভাবে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কেন সেই ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ হচ্ছে না, সেটাই বড় প্রশ্ন। শুধু শোকজ ও জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা দুঃখজনক।”
শেরপুর-১ আসন
রঙিন পোস্টার ব্যবহার ও অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারের অভিযোগে তিন প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ
ভোটের প্রচার শুরুর দিনেই বিএনপি–এর এক বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও ৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
দলীয় কোন্দলের জেরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সিলেট
জিন্দাবাজারে একটি নির্বাচনি ক্যাম্পে হামলা ও মোটরসাইকেল ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
কিশোরগঞ্জ
একটি জনসভাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
ইসির মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে—
প্লাস্টিক লেমিনেটেড রঙিন পোস্টারের ব্যাপক ব্যবহার
নির্ধারিত সময়ের বাইরে উচ্চশব্দে মাইক
মোটরশোভাযাত্রা ও ট্রাক মিছিল
এসবই নির্বাচনি আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে—
সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড
এক লাখ টাকা জরিমানা
গুরুতর ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা।
ইসির হিসাব অনুযায়ী, ৮–২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৭টি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৯টি মামলায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
৩০০ আসনে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৯৮১ জনে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা ছাড়া এই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।