বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: পারস্পরিক স্বার্থ ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

বাংলাদেশ ও ভারত—দুইটি রাষ্ট্র শুধু ভৌগোলিকভাবে প্রতিবেশী নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের কারণে সম্পর্কটি বহুমাত্রিক। তাই এই সম্পর্কের শক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সম্পর্কের প্রতিটি টানাপোড়েনও দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও জাতীয় স্বার্থকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বিশেষ করে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সম্পর্ক নিয়ে কথাবার্তা, আলোচনার মাত্রা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীল ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি রাখা জরুরি।

সম্পর্কের বাস্তবতা কী?

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি বড় বাস্তবতা হলো—দুই দেশ একে অপরের ভৌগোলিক ও কৌশলগত বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, পানি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, যাতায়াত—এগুলো এমন ইস্যু, যেখানে সহযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি কঠিন। অর্থাৎ সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ।

তবে বাস্তবতা এটাও—কিছু ইস্যুতে মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের। সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, পানিবণ্টন এবং নাগরিক পর্যায়ে ভুল বোঝাবুঝি—এসব বিষয় জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে। ফলে সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি জনমনে নেতিবাচক প্রশ্নও জাগে। সম্পর্ককে পরিণত ও স্থিতিশীল রাখতে এসব প্রশ্নের পরিষ্কার, যৌক্তিক ও কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।

পারস্পরিক স্বার্থ—কে কী লাভ করে?

বাংলাদেশের স্বার্থ হলো—সম্মানজনক কূটনীতি বজায় রেখে ন্যায্য অধিকার আদায়, বাণিজ্যে সুবিধা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগে বাস্তব লাভ নিশ্চিত করা, এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে মানবিক ও শৃঙ্খলিত করা। অন্যদিকে ভারতের স্বার্থ—অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও সংযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুযোগের উন্নয়ন।

এই পারস্পরিক স্বার্থের জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুই দেশের স্বার্থ একেবারে বিপরীত নয়; অনেক ক্ষেত্রেই তা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। কাজেই সম্পর্ককে কেবল আবেগ বা সন্দেহ দিয়ে বিচার করলে বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না—বরং সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে পড়ে।

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে উত্তেজনা কেন বাড়ে?

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কে আবেগ জড়ানো স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবেশী সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবেগের অতিরিক্ত উত্তেজনা তৈরি হলে তা পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিত তথ্য, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য বা আক্রমণাত্মক ভাষা সম্পর্কের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে। এতে বাস্তব আলোচনার জায়গা সংকুচিত হয়, আর জনগণও বিভাজিত হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো—পররাষ্ট্রনীতিকে দলীয় প্রচারণার ইস্যু না বানিয়ে জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ সরকার বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বদলায় না—এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

করণীয়: সমাধানমুখী কূটনীতি

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে টেকসই করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার প্রয়োজন—

  1. ইস্যুভিত্তিক আলোচনা ও সমঝোতা: পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য বৈষম্য ইত্যাদিতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

  2. জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক: সাধারণ মানুষ যেন বাস্তব সুবিধা পায়—ভিসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাণিজ্য—এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সহজীকরণ।

  3. কঠিন বিষয়ে ভদ্র কিন্তু দৃঢ় অবস্থান: জাতীয় স্বার্থ প্রশ্নে সংযত ভাষায় দৃঢ় কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

  4. গুজব ও উসকানি প্রতিরোধ: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্য ঠেকাতে সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ।

শেষ কথা

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনো একক ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি দীর্ঘ ইতিহাস ও বহুমাত্রিক বাস্তবতার সমষ্টি। তাই সম্পর্ক রক্ষার অর্থ অন্যায় মেনে নেওয়া নয়, আবার সম্পর্ক উন্নয়নের অর্থ উত্তেজনা তৈরিও নয়। প্রয়োজন সংযমী, বাস্তববাদী ও স্বার্থ-সচেতন কূটনীতি—যেখানে জাতীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে, আবার আঞ্চলিক সহযোগিতাও শক্তিশালী হবে।

সবশেষে বলা যায়—পররাষ্ট্রনীতি আবেগে নয়, বাস্তবতায় চলে। আর বাস্তবতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হলো—শান্ত, দৃঢ় এবং জনগণের কল্যাণমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ।

error: Content is protected !!