বিয়ানীবাজারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইবঞ্চিত ৯ শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা: থমকে যাচ্ছে শিশুদের পড়াশোনা

দেশ এডিশন সিলেট ডেস্ক :
প্রকাশ: ১ মাস আগে

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্রগুলো প্রান্তিক শিশুদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অন্যতম ভরসাস্থল। কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কমিটির কার্যক্রমের জটিলতায় বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৯টি কেন্দ্রের প্রায় ২৭০জন শিক্ষার্থীরা চলতি শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই না পাওয়ায় শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে—এমন চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

জানা গেছে, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশে বিয়ানীবাজার উপজেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় মোট ১৪০টি শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে এসব কেন্দ্রের জন্য ৬ হাজার ৪৬৭টি বই ও সমপরিমাণ খাতা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফিল্ড সুপারভাইজারের তথ্যমতে, এর মধ্যে ৯৮টি কেন্দ্রে বই ও খাতা বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে চলতি বছরে ৯টিসহ মোট ৪২টি কেন্দ্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

বাতিল হওয়া কেন্দ্রগুলোর তালিকায় রয়েছে—কোনাগ্রাম জামে মসজিদ, দক্ষিণ চরিয়া পশ্চিম জামে মসজিদ, কোনাশালেশ্বর মক্তব, দক্ষিণ শালেশ্বর মক্তব, বাউরবাগ মক্তব, লাইঝারি মক্তব, ধলিমপুর বায়তুল আকসা জামে মসজিদ, উত্তর সুপাতলা মসজিদ ও ঘুঙাদিয়া বিলপার মক্তব।

কেন্দ্র অনুমোদন ও বাতিলের ক্ষমতা প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজার উপজেলা ফিল্ড সুপারভাইজার ইকবাল হোসাইন জানান, বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মুড়িয়া ইউনিয়নের কোনাগ্রাম বায়তুসসালাম জামে মসজিদসহ বাতিল হওয়া ৯টি কেন্দ্র নিয়মিত পাঠদান চালু রাখলেও চলতি শিক্ষাবর্ষে কোনো পাঠ্যবই পায়নি। ফলে এসব কেন্দ্রে অধ্যয়নরত শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

কোনাগ্রাম বায়তুসসালাম জামে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, শিক্ষার্থী তালিকা, ছবি সংযুক্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কর্তৃক সত্যায়িত করে যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও উপস্থিতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট মহল তা আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ফিল্ড সুপারভাইজার ইকবাল হোসাইন জানান, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বাছাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯টি কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাছাইয়ের দিন ৭টি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল অনুপস্থিত ছিলেন, একটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষার্থী ছিল না এবং আরেকটি কেন্দ্রে শিক্ষকের একাডেমিক সনদের জটিলতা পাওয়া যায়।

বইবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “তারা পাশ্ববর্তী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে পারে, অথবা বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।”

এই বক্তব্যে অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন—যখন ইউএনও কর্তৃক সত্যায়িত শিক্ষার্থী তালিকা ও নথি বিদ্যমান, তখন কেবল একটি কমিটির সিদ্ধান্তে শিশুদের পাঠ্যবই থেকে বঞ্চিত করা কতটা যৌক্তিক?

একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“সব কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও যদি শিশুদের বই না দেওয়া হয়, তাহলে দায়ভার কার? কোনো অনিয়ম থাকলে তার দায় তো শিক্ষার্থীদের হতে পারে না।”

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশাসনিক জটিলতা বা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আগ পর্যন্ত অন্তত শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই সরবরাহ অব্যাহত রাখা উচিত। অন্যথায় এটি শিশুদের শিক্ষা ও সমান সুযোগের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ বাড়ছে। এলাকাবাসীর দাবি, ইউএনও কর্তৃক সত্যায়িত নথির ভিত্তিতে দ্রুত বই বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং কেন্দ্র বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি জনসম্মুখে স্পষ্ট করতে হবে। তাদের প্রত্যাশা—কোনো সিদ্ধান্তের বলি যেন আর কোনো শিশুকে হতে না হয়।

error: Content is protected !!