রাজনীতির ধোকাবাজিতে নয়: জবান ও নীতি গন্তব্য দেখায় -Π আতাউর রহমান

Π আতাউর রহমান
প্রকাশ: ২ মাস আগে

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চাবিকাঠি হলো বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাস রচিত হয় রাজনীতিকের জবান—তার ভাষা, বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি—এবং তার নীতি—নৈতিকতা, আচরণ, রাজনৈতিক আদর্শ—এসবের অবিচ্ছেদ্য সমন্বয়ে। ধোকাবাজির ‘ক্ষণিক চাতুর্য’ হয়তো ভোটের মাঠে জোয়ার তোলে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনীতিকে অবিশ্বাসের অন্ধকারে ঠেলে দেয়। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই প্রশ্নটি আবারও প্রবল হয়ে উঠেছে—আমরা কি ধোঁকাবাজির রাজনীতি চাই, নাকি সত্যবাদিতা ও মূল্যবোধে গড়ে ওঠা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব?

● চকচকে প্রতিশ্রুতির ফাঁদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোটের মৌসুম এলেই একই দৃশ্য—মাঠজুড়ে অগণিত প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের ঝলমলে স্বপ্ন, ও বিরোধী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ। কিন্তু যেসব প্রতিশ্রুতি পাঁচ বছরেও পূরণ হয় না, সেগুলো কি সত্যিই জনগণের কল্যাণে দেওয়া, নাকি ভোট জয়ের কৌশল?
অতীতে আমরা দেখেছি—গণপরিবহন সংকট দূর করার অঙ্গীকার, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিক্ষার আধুনিকীকরণ, কিংবা দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাচন শেষ হলেই উধাও।
এ থেকেই বোঝা যায়, জবান যদি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে সেটি জনগণের ‘বিশ্বাসের ভাণ্ডার’কে খালি করে দেয়। বিশ্বাসহীন রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা হারায়, এবং রাষ্ট্রের অগ্রগতিও থমকে দাঁড়ায়।

● নীতিহীন রাজনীতি—রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত

রাজনীতিতে নীতি শুধু তাত্ত্বিক শব্দ নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের নকশা। উদাহরণস্বরূপ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দাবির পাশাপাশি যদি দলীয় নেতাকর্মীদের অপকর্ম রক্ষা করা হয়, তবে তা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
সমাজে বিচারহীনতা তৈরি হলে মানুষ বিকল্প শক্তি খুঁজে নেয়—কখনো তা উগ্রতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, কখনো আবার নির্লিপ্ততার দিকে। উভয় অবস্থাই গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে।
এ কারণেই রাজনৈতিক নীতির দৃঢ়তা শুধু দলের জন্য নয়, রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের জন্যও অপরিহার্য।

● আসন্ন নির্বাচনের বাস্তবতা: জনগণ এখন বেশি সচেতন

আগের তুলনায় এখন জনগণ অনেক বেশি তথ্যনির্ভর, সচেতন এবং তুলনামূলকভাবে সাহসী। সোশ্যাল মিডিয়া, নাগরিক সাংবাদিকতা এবং বিভিন্ন তথ্যউৎসের কারণে ভোটাররা শুধু ‘কাজের হিসাব’ নয়, রাজনীতিকের চরিত্র, অতীত, প্রতিশ্রুতি পালনক্ষমতা—সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখে।
ভোটারদের কাছে এখন প্রশ্ন—
★ কে কথায় এবং কাজে সঙ্গতি রাখে?
★ কে নির্বাচনের আগে-পরেও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে?
★ কার বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, থাকে রাষ্ট্রদৃষ্টি?

এবারের নির্বাচন তাই শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি একটি নীতি-পরীক্ষা—যেখানে জবান, নৈতিকতা ও সততার ওপর ভিত্তি করেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাচাই হবে।

● ধোকাবাজির রাজনীতি মুহূর্তিক লাভ দেয়, স্থায়ী ক্ষতি করে

ধোকাবাজির রাজনীতি সাধারণত তিনটি পথে ধ্বংস ডেকে আনে—
১. ভোটারদের হতাশা তৈরি হয়: প্রতারিত মানুষ ভোটকেন্দ্র বিমুখ হয়।
২. দল ভেতর থেকে দুর্বল হয়: নীতিহীন নেতৃত্বের কারণে ত্যাগী কর্মীরা দূরে সরে যায়।
৩. রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়: দুর্নীতি, পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি বেড়ে যায়।

বিশ্বের বহু দেশের উদাহরণ আছে—স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তায় ভর করে ক্ষমতায় ওঠা সরকারগুলো নৈতিকতা হারানোর কারণে দ্রুতই জনসমর্থন হারিয়েছে। বাংলাদেশেও এ পাঠ নতুন নয়।

● জবান ও নীতির ওপর দাঁড়িয়েই টেকসই রাজনীতি

বাংলাদেশের সামনে এখন বোঝাপড়ার সংকট নয়, বিশ্বাস পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ। ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা—এই তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা রাজনীতিই দেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে।
যে নেতারা কথার সঙ্গে কাজ মিলিয়ে চলেন, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকে দীর্ঘমেয়াদি; তারা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনেও সফল হন।

আসন্ন নির্বাচনে তাই প্রয়োজন সঠিক বার্তা— যে রাজনীতি ধোকাবাজির, তা সাময়িক করতালি পায়;
কিন্তু যে রাজনীতি জবান ও নীতির, তা ভবিষ্যৎ গড়ে।

● শেষকথা

নির্বাচন সামনে রেখে এখন দেশের প্রতিটি দল ও নেতার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
তারা কি জনগণের বিশ্বাস অর্জনের রাজনীতি করবে, নাকি ধোকাবাজির পুরোনো পথে হাঁটবে?

ভোটের দিন ঘনিয়ে আসছে, আসছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মুহূর্ত। এই সময়ের দাবি— “রাজনীতির ধোকাবাজিতে নয়: জবান ও নীতি গন্তব্য দেখায়।”

error: Content is protected !!