চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে সিলেটে ঘটেছে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়। গত ১২ বছরের মধ্যে এবার পাসের হার সর্বনিম্ন—মাত্র ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই এবারের পরীক্ষায় ফেল করেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সিলেট শিক্ষাবোর্ডের সম্মেলন কক্ষে বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করেন বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, বিশেষ করে ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে খারাপ ফলের কারণে সামগ্রিক ফলাফল খারাপ হয়েছে।
এবার সিলেট বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৬৯ হাজার ৯৪৪ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬৯ হাজার ১৭২ জন শিক্ষার্থী। পাশ করেছেন ৩৫ হাজার ৮৭০ জন, যার মধ্যে ছেলে ১৩ হাজার ৮৭০ জন এবং মেয়ে ২২ হাজার ১ জন। পাশের হারে মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে আছে। ছেলেদের পাশের হার ৪৯ দশমিক ৯৬ ভাগ আর মেয়েদের পাশের হার ৫৩ দশমিক ১৩ ভাগ।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, সবচেয়ে কম পাসের হার মানবিক বিভাগে—মাত্র ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগে পাশের হার ৭৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫০ দশমিক ১৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে বড় ধস। এ বছর সিলেট বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৬০২ জন, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৬৯৮। এদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ৩৭৯ জন, মানবিক বিভাগে ১৫৩ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৭০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
সিলেট বিভাগের চার জেলায় ফলাফলে ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। পাশের হারে সবচেয়ে এগিয়ে সিলেট জেলা, যেখানে ৬০ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জে ৪৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ৪৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং মৌলভীবাজারে ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে—যা পুরো বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে কম।
জাতীয় প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ঢাকায়—৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এরপর বরিশালে ৬২ দশমিক ৫৭, রাজশাহীতে ৫৯ দশমিক ৪০, দিনাজপুরে ৫৭ দশমিক ৪৯, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ৫৭, সিলেটে ৫১ দশমিক ৮৬, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৫৪, যশোরে ৫০ দশমিক ২০ এবং সর্বনিম্ন কুমিল্লা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সিলেট বোর্ডের গত ১২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাশের হার ছিল ৮৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭১ দশমিক ৬২ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, ২০২০ সালে শতভাগ (অটোপাস), ২০১৯ সালে ৬৭ দশমিক ০৫, ২০১৮ সালে ৭৩ দশমিক ৭০, ২০১৭ সালে ৭২ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৬৮ দশমিক ৫৯, ২০১৫ সালে ৭৪ দশমিক ৫৭ এবং ২০১৪ সালে ৭৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি বছর সিলেট বোর্ডের ফলাফল এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমে এসেছে।
শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের মতে, “ইংরেজি ও কিছু জটিল বিষয়ে দুর্বল পারফরম্যান্সই ফলাফলের প্রধান বাধা।” শিক্ষাবিদদের মতে, করোনা-পরবর্তী শিক্ষায় আগ্রহহীনতা, পাঠদানে ঘাটতি, প্রশ্ননকশা অনুধাবনের অক্ষমতা এবং দুর্বল একাডেমিক মনোযোগই শিক্ষার্থীদের এই হতাশাজনক ফলাফলের পেছনে মূল কারণ।
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও পরীক্ষাভিত্তিক দক্ষতা গঠনে এখন প্রয়োজন গভীর বিশ্লেষণ, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীর মানসিক অনুপ্রেরণা তৈরির কার্যকর উদ্যোগ। সিলেটের এই ফলাফল শিক্ষা প্রশাসন ও অভিভাবকদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।