ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২৯৯টি আসনের বেসরকারি ফলাফলের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৭৫টি আসনে জয় পেয়েছে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা। ফলে এককভাবেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ আসনের সীমা অতিক্রম করেছে দলটি।
অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে ৫৬টি আসনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবার প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে—যা দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শীর্ষ নেতাদের জয়
ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এবারই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুই আসনেই বিজয়ী হন।
অন্যদিকে, ঢাকা-১৫ আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর এই জয় দলটির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির ক্ষমতার ইতিহাস
সর্বশেষ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র দেওয়ার মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করে বিএনপি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ২৭ নভেম্বর তিনি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
দলের পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল—ক্ষমতায় গেলে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা শুরু। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
সংসদীয় সমীকরণ ও বিরোধী রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা
বাংলাদেশে সরকার গঠনের জন্য ৩০০ আসনের মধ্যে কমপক্ষে ১৫১টি আসনে জয় প্রয়োজন। বেসরকারি ফল অনুযায়ী বিএনপি এককভাবেই সেই সংখ্যা অতিক্রম করেছে।
তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা হলো—জামায়াতে ইসলামীর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ। অতীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলে থাকলেও এবারই প্রথম তারা স্বতন্ত্রভাবে প্রধান বিরোধী শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংসদীয় রাজনীতিতে ভারসাম্য, জবাবদিহিতা ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনার ইঙ্গিত বহন করছে।