শীতের ভোর। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো নিঝুম দ্বীপ তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। হঠাৎ নদীর বুকে ডানা ঝাপটানোর শব্দে নীরবতা ভেঙে উড়ে যায় এক ঝাঁক অতিথি পাখি। আলো ফোটার আগেই সেই দৃশ্য জানান দেয়—শীত এলেই নিঝুম দ্বীপ শুধু একটি দ্বীপ নয়, হয়ে ওঠে ডানার রাজ্য।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে সুদূর সাইবেরিয়া, মধ্য এশিয়া, ইউরোপ ও হিমালয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসে আশ্রয় নেয় নোয়াখালী জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে। অক্টোবরের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে মার্চ পর্যন্ত চলতে থাকে এই পাখির আগমন। খাল, বিল, নদীর চর ও বনভূমি ভরে ওঠে তাদের কলতানে—নীরব অথচ প্রাণবন্ত এক উৎসবে।
নিঝুম দ্বীপের চরাঞ্চলে হাঁটলে চোখে পড়ে পাতিহাঁস, নীলশির, সরালি, লেঞ্জা, বাটান, পানকৌড়ি ও গাংচিলের ঝাঁক। কখনো তারা নদীর জলে খাবার খোঁজে, কখনো চরে বসে বিশ্রাম নেয়। সূর্যের আলো গায়ে মেখে ডানা ঝাপটানোর সেই দৃশ্য যে কাউকে মুহূর্তেই শহরের কোলাহল ভুলিয়ে দেয়। প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এ যেন প্রকৃতির তৈরি এক জীবন্ত সিনেমা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে শীতকালে তাপমাত্রা অত্যন্ত কমে যাওয়ায় জলাশয় বরফে ঢেকে যায় এবং খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। তখন উষ্ণতা ও খাদ্যের সন্ধানে অতিথি পাখিরা দক্ষিণ এশিয়ার দিকে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশে শীতকালে আবহাওয়া তুলনামূলক সহনীয় হওয়ায় এবং জলাভূমিতে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকায় এসব পাখি নিরাপদ আশ্রয় পায়।
নিঝুম দ্বীপের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যই পাখিদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। বিস্তৃত চর, নদী, বনাঞ্চল ও নির্জন পরিবেশ তাদের জন্য আদর্শ আবাসভূমি তৈরি করেছে। তাই প্রতিবছর নির্দিষ্ট মৌসুম এলেই তারা ফিরে আসে এই দ্বীপে—যেন পুরোনো ঠিকানায় ফেরা।
শীতের সকালে পর্যটক ও আলোকচিত্রীরা ভিড় করেন নিঝুম দ্বীপে। ভোরের আলোয় নদীর বুকে পাখির উড়াল আর চরাঞ্চলের কলতানে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। অনেকের কাছে নিঝুম দ্বীপ মানেই শীতের এই পাখির উৎসব—কেউ আসে ছবি তুলতে, কেউ আসে প্রকৃতির কাছে একটু শান্তি খুঁজতে।
তবে এই সৌন্দর্যের মাঝেই রয়েছে শঙ্কা। অতিথি পাখি শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংস হলে এই উৎসব থেমে যেতে পারে। পরিবেশবাদী ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পাখি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও কঠোর নজরদারি জরুরি। পাখিরা নিরাপদ থাকলেই নিঝুম দ্বীপ তার এই অনন্য সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারবে।
মার্চ-এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা বাড়লে অতিথি পাখিরা আবার নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। তখন নিঝুম দ্বীপ কিছুটা নীরব হয়ে পড়ে। তবে থেকে যায় ডানার শব্দ, কলতান আর শীতের সকালের অপার মুগ্ধতার স্মৃতি।
শীতে নিঝুম দ্বীপে অতিথি পাখির আগমন শুধু প্রকৃতির একটি ঘটনা নয়—এটি এক অনুভূতি। যারা একবার এই ডানার মেলায় হারিয়ে গেছে, তারা জানে নিঝুম দ্বীপ শীতে শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়।